মোবাইল হাতে পেয়েই জ্বলে উঠেন রোজিনা
তিস্তা পাড়ের হতদরিদ্র নারীদের মোবাইলে কৃষি ও প্রাণিসেবা দিয়ে এলাকার ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন রোজিনা আক্তার। ৯ম শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০১০ সালে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তিস্তার পাড় সংলগ্ন দক্ষিণ খড়িবাড়ী গ্রামের দিনমুজুর আব্দুল কাদেররের সঙ্গে বিয়ে হয় রোজিনার।
বিয়ের সময় পরিবারের ভালো অবস্থা থাকলে তিস্তার ভাঙনে সব হারিয়ে তিস্তার বামতীর বাঁধে আশ্রয় নেয় রোজিনার পরিবার। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে দিনমজুর স্বামীর পাশাপাশি কৃষি কাজ শুরু করেন এ সাধারণ নারী। কৃষক হিসেবে ধান, বসতবাড়িতে শাক সবজি, গরু, ছাগল হাঁস-মুরগি পালন করে ধীরে ধীরে জ্বলে উঠেন রোজিনা।
কৃষি চাষাবাদের সময় রোজিনা আক্তার বিভিন্ন সমস্যায় পড়তেন। অনেক বিষয় নিজেই সমাধান করতে পারতেন, আবার অনেক সময় পারতেন না। সেই কারণে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। পরবর্তীতে উপায় খুঁজতে রোজিনা আক্তার পল্লীশ্রী রিকল প্রকল্পের কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন ধরনের মিটিংয়ে যেতেন তিনি।
এর মধ্যে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিক প্রকল্পের মাধ্যমে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন হাতে পান রোজিনা। মোবাইল ফোনটি হাতে পাওয়ার পর তিনি ফোনটি ব্যবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণ পান। প্রশিক্ষণ পরবর্তী সময়ে তিনি মোবাইলের মাধ্যমে কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য পান। পাশাপাশি কৃষি বিষয়ে তথ্য জানার সুযোগ হয় তার। বলতে গেলে এ মোবাইল হাতে পেয়েই জ্বলে উঠেন রোজিনা।
জানা গেছে, বোরো মৌসুমে রোজিনা আক্তার বোরো ধান চাষ করেন। তার জমিতে পোকা দেখা দিলে তিনি প্রতিক কল সেন্টারে কল দিয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে ওষুধ প্রয়োগ করে সমাধান করেন।
এছাড়া কৃষি চাষাবাদের পাশাপাশি রোজিনা আক্তার গাভি পালন করেন। তিন মাস আগে তার গাভির জ্বর, কাশি ও নাক দিয়ে পানি ঝরা রোগ দেখা দিলে তিনি প্রতিক কল সেন্টারে কল করে পরামর্শ নেন এবং সমাধানের চেষ্টা করেন।
পাশাপাশি প্রতিক এসএমএস থেকে রোজিনা আক্তার বোরো ধানের মৌসুমে ঘন কুয়াশায় বীজতলা রক্ষার জন্য পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে- এমন ম্যাসেজ পেলে তিনি বীজতলা রাতে ঢেকে রাখেন এবং সকালে বীজতলা থেকে পলিথিন সরিয়ে নেন। এভাবে তিনি কুয়াশার সময় ৮ দিন ঢেকে রেখে ধানের চারা রক্ষা করেন। এতে তিনি ভালো ফল পেয়েছেন এবং ভালো চারাও পেয়েছেন।
এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় রোজিনা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, দোয়েল জনসংগঠনের সভানেত্রী হওয়ায় তিস্তা পাড়ের হতদরিদ্র কৃষকদের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ চিকিৎসাসেবা বিষয়ে পরামর্শ দিই। পাশাপাশি পল্লীশ্রীর প্রতিক সংগঠনের মাধ্যমে স্থানীয়দের বিনামূল্যে পরামর্শ দিই। সপ্তাহের একদিন সদস্যদের এ বিষয়ে অবগত করা হয়। পাশাপাশি অনেকেই ফোন দিয়ে পরামর্শ নেন এবং এসএমএস দিয়ে তাদের নানা বিষয়ে অবগত করি।
এ সংগঠনের উপকারভোগী বুলবুলি আক্তার (৩৫) জানান, আগে ধানের রোগ হলে উপজেলা কৃষি অফিসে যেতে হতো। দেখা যাচ্ছে ডিমলা যাওয়া-আসায় ২০০ টাকা খরচ হতো। এখন রোজিনার সুবাদে ধানখেতে বসে কল দিলেই রোজিনার পরামর্শ পাই।
স্থানীয় রিক্তা আক্তার বলেন, ছাগলের রোগ হলে সমস্যায় পড়তে হতো। দুর্গম এলাকা থেকে উপজেলা নিয়ে যাওয়া কষ্টকর ছিল। এখন রোজিনার কারণে বাড়িতে বসেই প্রাণিসম্পদের সেবা পাচ্ছি।
পল্লীশ্রী রিকল প্রকল্পের ফিল্ড ফেসিলিটেটর সুমিত্রা রানী জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিক প্রকল্পের আওতায় তিস্তা পাড়ের হতদরিদ্র নারীরা কৃষিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
পল্লীশ্রী রিকল প্রকল্পের সমন্বয়কারী পুরান চন্দ্র বর্মন জাগো নিউজকে বলেন, তিস্তা পাড়ের ১৫০ জন নারীকে স্মার্টফোন বিতরণ করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এতে কৃষিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হবেন নারীরা।
জাহেদুল ইসলাম/এএম/আইআই