ত্রাণের উপর ঘুমাচ্ছে রোহিঙ্গারা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০১:৪২ পিএম, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭

ত্রাণে ভর্তি নিবন্ধিত সব রোহিঙ্গাদের ঘর। এরপরও প্রতিদিন পাচ্ছে কারও না কারও সহযোগিতা। এসব রাখার জায়গা হচ্ছে না। এরপরও থেমে নেই ‘অভাবি জাহির করা’ হাত টানা। এভাবে নেয়া অতিরিক্ত ত্রাণ হাটে-বাজারে মহল্লায় বিক্রি করে দিয়ে জমাচ্ছে নগদ টাকা। তাদের বিক্রি করা ত্রাণ যোগারে হুমড়ি খাচ্ছে সুযোগ সন্ধানীরা। এমন সব অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।

তবে, রোহিঙ্গাদের মাঝে কি পরিমাণ ত্রাণ মজুদ রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কোথাও। কিন্তু ধারণা নিতে জরিপ চালাচ্ছে রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্টরা।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে অভিযোগ আসছিল রোহিঙ্গারা হাটে-বাজারে ও মহল্লায় ত্রাণ সামগ্রী বিক্রি করছে। এটি জানতে প্রশাসন সম্প্রতি পরিদর্শনে যায়। তথ্যের সত্যতার পাশাপাশি অধিকাংশ রোহিঙ্গার বাসায় চাহিদার অতিরিক্ত খাদ্যপণ্য মজুদের চিত্রও দেখতে পেয়েছে পরিদর্শকদল।

বিষয়টি নজরে আসার পর ত্রাণ বিতরণে শিথিলতা আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সবার ঘরে এক ধরনের ত্রাণ থাকবে না। কেউ নির্লজ্জভাবে চলাকলায় বেশি আদায় করেছে। কোনো রোহিঙ্গার ঘরে ত্রাণ না থাকেলে তাদের সরবরাহ করতে মনিটরিং চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন রোহিঙ্গারা ত্রাণ পেয়েছে। যেসব পরিবারে লোক সংখ্যা বেশি তারা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে কৌশলে ত্রাণ সংগ্রহ করে। এমন অনেক রোহিঙ্গা পরিবারে ত্রাণ রাখার জায়গাও নেই। ঘরগুলো সাধারণ শামিয়ানার ওপর হলেও কোনো ঘরেই এখন আর আসবাবপত্র ও নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের কমতি নেই। গ্যাস সিলিন্ডার, চুলা, জগ-গ্লাস, থালা-প্লেট, জামা-কাপড় সবই আছে পর্যাপ্ত। কোনো কোনো ঘরে এত বেশি ত্রাণের বস্তা রাখা আছে যে সেসব ঘরে আর কোনো বাড়তি জিনিস রাখার জায়গা নেই। ফলে অতিরিক্ত ত্রাণ রোহিঙ্গারা কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। এসব ত্রাণ সামগ্রী স্থানীয়রা কম দামে কিনে নিচ্ছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক ব্যবসা বেড়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। আবার অনেকে এসব ত্রাণ কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে। রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ এসব ত্রাণ গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিক্রি করছে।

তবে, রোহিঙ্গাদের অজুহাত-তাদের হাতে টাকা পয়সা নেই, তাই অতিরিক্ত ত্রাণ রেখে লাভ কি? তাই তারা ত্রাণগুলো বিক্রি করে টাকার যোগার করা হচ্ছে।

বালুখালীর বাসিন্দা শ. ম গফুর বলেন, উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে প্রতিদিনই টন টন ত্রাণ ও নগদ টাকা সহায়তা দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি ক্যাম্পেই রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ। এসব ক্যাম্পের ত্রাণের কারণে ঘুমানোর মতো জায়গাও নেই। তবে কিছু রোহিঙ্গার অভিযোগ, তারা বিক্রি করার মতো ত্রাণ পায়নি। মাঝিরাই ত্রাণগুলো বেশি নিচ্ছে, তারাই বিক্রি করছে।

এদিকে ত্রাণ বিতরণের কাজে যুক্ত কর্মকর্তাদের সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ত্রাণসামগ্রী দেয়া হচ্ছে। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি গৃহনির্মাণ সামগ্রী, কম্বল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেয়া হয়।

বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২নং ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের চেমন আরা জানান, বাংলাদেশে আসার পর থেকে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ পেয়েছি। মিয়ানমারে যে অভাব ছিল তা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নেই। প্রতি সপ্তাহেই ত্রাণ পায়। তার ছোট ঘরে এত ত্রাণ রাখার জায়গা নেই। তাই ত্রাণ বিক্রি করে কিছু নগদ টাকা হাতে নিয়েছি।

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের লম্বাশিয়া বস্তিতে ঝুপড়িতে বসবাস করা আকবর আলী ও ছখিনা বেগমের ঘরে গিয়ে দেখা গেছে, ত্রাণের জন্য তাদের ঝুপড়িতে তিল ধারণের জায়গা নেই। এমন কি তারা দুই সন্তান নিয়ে রাতে ত্রাণের উপরই ঘুমান।

আকবর বলেন, আল্লাহর রহমতে খুব ভালো আছি, বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো। তিনি বলেন, আসার পর থেকে অনেক ত্রাণ পেয়েছি, তাই এত চাল, ডাল ও তেল নিয়ে কী করবো। এজন্য স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছি। হাতে কিছু নগদ টাকা থাকলে আর কোনো ভয় থাকে না। চারজনের পরিবার ১৫-২০ কেজির মতো চাল ত্রাণ হিসেবে প্রতিবার পান বলে জানান তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগদ টাকার জন্য দেশি-বিদেশি সাহায্য সংস্থা, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেয়া বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করে দিচ্ছে রোহিঙ্গারা। বাজারে থাকা দামের চেয়ে অর্ধেক দামে এসব সামগ্রী বিক্রি করে তারা। আর অল্পমূল্যে কেনা এসব ত্রাণসামগ্রী বেশি দামে বিক্রি করছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।

ত্রাণ কিনতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক কয়েকটি সিন্ডিকেটও গড়ে উঠেছে এরই মধ্যে। কুতুপালং, বালুখালী, হাকিম পাড়া, তাজনিরমার ঘোনা, জামতলীসহ সব ক্যাম্পেই একই চিত্র।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে এক কেজি চালের দাম ৫০-৬০ টাকা। সেখানে রোহিঙ্গারা ত্রাণের চাল বিক্রি করছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি। ৬০ টাকা কেজি দরে চিনি কিনে রোহিঙ্গাদের দেয়া হচ্ছে। আর রোহিঙ্গারা সেই চিনি বিক্রি করছে ৩০ টাকায়। বাজারে প্রতি কেজি ডালের দাম ১২০ টাকা। সেখানে রোহিঙ্গারা বিক্রি করছে ৬০ টাকায়। ১২০ টাকা লিটারের সয়াবিন তেল বিক্রি করছে মাত্র ৬০ টাকায়। এ ছাড়া ৫০০ গ্রাম ডানো দুধ বিক্রি করছে ৮০ টাকায়। চিঁড়া বাজারে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও রোহিঙ্গারা বিক্রি করে ১৫ টাকা কেজি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫-৭ জন সদস্যের একটি রোহিঙ্গা পরিবারকে সপ্তাহে দুই বার ত্রাণ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১০-১৫ কেজি চাল, ২-৩ কেজি ডাল ও ২-৩ লিটার তেল দেয়া হয়। এ হিসাব অনুযায়ী, তারা সপ্তাহে ২০-৩০ কেজি চাল, ৪-৬ কেজি ডাল ও ৪-৬ লিটার তেল পান।

বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, আমার বাড়িতে অনেক ত্রাণ আছে। এখন টাকার প্রয়োজন তাই ত্রাণ বিক্রি করছি।

কুতুপালং বাজারে চাল বিক্রি করতে আসা রোহিঙ্গা মর্জিনা বলেন, গত ২০ দিনে বাসায় পাঁচ বস্তা চাল জমা হয়েছে। এ মূহুর্তে চাল আর লাগছে না। টাকার প্রয়োজনে দুই বস্তা চাল ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে দিয়েছি।

রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিক্রির ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বালুখালী ক্যাম্প ইনচার্জ সোহেল রানা বলেন, চেকপোস্টগুলোতে প্রতিদিন ত্রাণসহ লোকজন আটকের ঘটনা ঘটছে। বিষয়গুলো নজরদারির মধ্যে রাখার পরও কোনো না কোনোভাবে রোহিঙ্গারা তা বিাক্র করছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, সারাক্ষণ মনিটরিং রাখতে হলে এখন যারা দায়িত্ব পালন করছে তারা ছাড়া অতিরিক্ত তিন থেকে চারশ লোক দরকার। যা বর্তমানে নেই। অনেক জায়গায় রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের কাছে অথবা পূর্বে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে ত্রাণ বিক্রি করে দেয় বলে খবর পেয়েছি। এসব কারণে বুধবার থেকে সাত দিন ব্যক্তি ও অন্য বেসরকারি সংস্থার ত্রাণ বিতরণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সায়ীদ আলমগীর/এমএএস/আইআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।