বছরজুড়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতেই ঢাকা পড়েছে সব ঘটনা
মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেছে ২০১৭ সাল। পহেলা জানুয়ারি সোমবার বছরের প্রথম দিন হিসেবে শুরু হয়ে বিদায় নিয়েছে রোববারের সূর্যডুবি। ৩৬৫ দিনে কক্সবাজারে নানা ঘটন-অঘটন রেখে গেছে সদ্য বিদায়ী ২০১৭ সালটি। তার মাঝে আগস্ট মাসে শুরু হওয়া অমানবিকতায় ভরা রোহিঙ্গা ইস্যুটি বছরের সব ঘটনাকে ছাপিয়ে এখনও রয়েছে আলোচনা। পরিণত হয়েছে ‘টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ। এ সুবাধে কক্সবাজার ও সীমান্ত উপজেলা উখিয়া এবং টেকনাফে পা পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সংস্থা প্রধানের।
এটি ছাড়াও জেলায় আলোচিত ঘটনা প্রবাহের মধ্যে ছিল, চাঁদাবাজির ১৭ লাখ টাকাসহ ডিবির ৭ সদস্য আটক, বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণের দু’বিমান বিধ্বস্ত, হোটেল শৈবালের বার থেকে অর্ধকোটি টাকার অবৈধ বিদেশি মদ উদ্ধার, রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবায় কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সেঞ্চুরি পার করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর প্রধান ও প্রতিনিধিদের নিয়ে কক্সবাজারে সম্মেলন অনুষ্ঠান ছিল বছরের অন্যতম।
২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে দুর্বৃত্ত হামলার অভিযোগে ২৫ আগস্ট থেকে সেই দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের উপর পাশবিকতা চালিয়ে গণহত্যা-ধর্ষণ করেছে। ফলে নির্যাতনের মুখে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ঠাঁই নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের এই ঘটনাটি ২০১৭ সালে পুরো বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের চেয়ে কক্সবাজার ও উখিয়া-টেকনাফ আলাদাভাবে উঠে আসে বিশ্ব মিডিয়ায়। আর নতুন পুরাতন মিলে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে বিশ্বজুড়ে এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কক্সবাজারবাসী।
এক সেপ্টেম্বর রাত থেকে উখিয়ার বালুখালী, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে রোহিঙ্গারা। এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে। আসা অব্যাহত রয়েছে এখনও। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ঠাঁই দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে। তারপরও মানবতার স্বার্থে উখিয়ার প্রায় কয়েক হাজার বনভূমি উজাড় করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় গড়ে দেয়া হয়েছে।
মগের মুল্লুকের হৃদয় বিদারক ঘটনায় পালিয়ে আসাদের শুধু ঠাঁই দিয়ে মানবতার দায়িত্ব শেষ করেনি বাংলাদেশ। বিপদাপন্ন রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসে সারাদেশের মানুষ। বিদেশি সহযোগিতা আসার আগে খাদ্য, চিকিৎসা সেবা নিয়ে সারাদেশ থেকে ছুটে আসে মানুষ। পরে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সাহায্য সংস্থা সহায়তা দেয়া শুরু করে এখনও অব্যাহত রেখেছে। চিকিৎসা সেবায় অবদান রেখেছে কক্সবাজার সদর ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিক।
সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতনে ৬ হাজার ৭০০ হাজার রোহিঙ্গা নির্মম-নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছে বলে দাবি করছে বিশ্ব সংস্থা। এটাকে গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবতাবাদি সংগঠন। এটি শতাব্দির সবচেয়ে বড় গণহত্যা বলেও দাবি করেছে অনেক দেশ। এ গণহত্যায় অনেকে মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের অনেককে হারিয়েছেন।
২৫ অক্টোবর ভোরে টেকনাফে এক কাউন্সিলরের ব্যবসায়ী ভাইকে জিম্মি করে আদায় করা ১৭ লাখ টাকাসহ সেনাবাহিনীর হাতে ডিবির অফিসারসহ ৭ জন আটক ও বরখাস্তের ঘটনাটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। টেকনাফ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মনিরুজ্জামানের ভাইকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে আটকের পর জিম্মি করে আদায় করা ১৭ লাখ টাকাসহ ডিবি পুলিশের অফিসারসহ ৭ জনকে আটক করেছে সেনাবাহিনীর একটি দল। এসময় তাদের ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাসও জব্দ করা হয়। বুধবার ভোর ৪টার দিকে ডিবির এসব সদস্যকে আটক করা হয়। পরে জেলা পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন তাদের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন।
পর্যটন কর্পোরেশনের মালিকানাধীন পর্যটন গলফ বারে সরকারি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় গোয়েন্দা টিমের অভিযানটি ছিল খুবই আলোচিত ঘটনা। ১৬ ডিসেম্বর অধিদপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পরিচালক (ডিডি) একেএম শওকত ইসলামের নেতৃত্বে রাত নয়টা থেকে ১টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়। অভিযানে হোটেল শৈবালের সীমানায় পর্যটন গলফ বার ভবনের লাগোয়া কর্মচারী আবাসনে খাটের নিচে ১০ ফুট বাই ৪ ফুট প্রস্থ এবং ৪ ফুট গভীর একটি গর্ত করে অবৈধ বিলেতি মদগুলো লুকিয়ে রাখা হয়। সেটা খুড়ে ১৭০৪ কান ভদকা, হাইগ হুইস্কি ১৩৬ বোতল, ৬৯ বোতল টিয়ারচার্স হুইস্কি, ব্ল্যাক লেভেল ১৬০ বোতল, ২৪ বোতল ব্ল্যাক রাম, টাকিলা ড্রাইজিন ৮৮ বোতল, ইউমবেলী ড্রাইজিন ৫ বোতল, ভোগা ড্রাইজিন ৬০ বোতল, মাটিনি উইন ২ বোতল, টেবল মাউন্টেইন ১৪ বোতল ও ১২ বোতল টু-ওশান বিদেশি মদ জব্দ করা হয়েছে।
উদ্ধার এসব মদের পরিমাণ ৯৭৪ দশমিক ৫০০ মিলি লিটার। শৈবালের পর্যটন গলফ বারের নামে বৈধ লাইসেন্স এর আড়ালে দীর্ঘ দিন অবৈধ মাদকের রমরমা ব্যবসা করে আসছে ইজারা নেয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ফিমা এন্টারপ্রাইজ’। এই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তারা কোটি কোটি টাকার অবৈধ মাদকদ্রব্য মজুদ ও বিক্রি করেছিল। এ গ্রুপটির সঙ্গে গভীর সখ্যতা রয়েছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের বিশেষ ব্যক্তিদের। ‘ভাগবাটোয়ারা’র কারণে তারা এতদিন অনৈতিক এ ব্যবসায় বাধা দেয়ার পরিবর্তে সহযোগিতাই দিয়ে এসেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর অধিদপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগ সাহসি অভিযানটি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ বিদেশি মদ জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ২৭ ডিসেম্বর উড়ন্তাবস্থায় সংঘর্ষে বিমানবাহিনীর দুটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ছিল বছরের শেষ সময়ে উল্লেখ করার মতো ঘটনা। ওইদিন সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে সংগঠিত সংঘর্ষে বিমান দুটির বিধ্বস্তাংশ মহেশখালী পৌরসভার পুটিবিলা পালপাড়া ও উপজেলার ছোট মহেশখালী এলাকায় পড়ে আগুন ভস্মীভূত হয়েছে। তবে দু’বিমানের পাইলটগণ অক্ষত ছিলেন।
আশ্রিত রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবায় একশ দিন পার করে একটি মাইলফলক সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কক্সবাজার জেলা শাখা। এ শত দিনে ৩৪ হাজার ৭৮৫ জন রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ সরবরাহ করেছে ছাত্রলীগের মনিটরিং সেল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবায় এই মনিটরিং সেল ও ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প চালু করে।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের তত্ত্বাবধানে উখিয়ার বালুখালীস্থ টিভি টাওয়ার এলাকায় উক্ত মেডিকেল ক্যাম্প থেকে প্রতিদিন চিকিৎসা সেবা, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমদ জয়।
তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার নেত্রী। মানবিক কারণেই তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ছাত্রলীগের এই কার্যক্রম চালু করা হয়। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৩৫৬ জন পুরুষ, ১০ হাজার ৭৮৯ জন মহিলা ও ১৭ হাজার ৬৪০ জন শিশু রোগীকে সেবা দেয়া হয়েছে।
সর্বশেষ শুক্রবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি ছাত্রলীগের মনিটরিং সেল ও ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প থেকে চিকিৎসা সেবা, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করেন।
এমএএস/আরআইপি