কক্সবাজারে থমকে গেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অভিযান

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ০৯ জানুয়ারি ২০১৮

সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে সীমান্তে আগেরমতো কড়াকড়ি আর নেই। আবার টেকনাফে ১৭ লাখ টাকাসহ ডিবির ৭ সদস্য সেনাবাহিনীর হাতে আটকের পর থেকে অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে মাদক নিয়ন্ত্রণে ডিবির কার্যক্রম। এসব ঘটনায় এখন পোয়াবারো অবস্থা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের।

এরপরও টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে একাধিক চেকপোস্ট রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রণে কাজ করায় সড়ক পথে সন্তর্পণে পা ফেলছে মাদক ব্যবসায়ীরা। মাদকের বিশালাকার চালান নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে নৌপথকে ব্যবহার করছে মাদক সংশ্লিষ্টরা। মাঝে মাঝে হাতেগোনা কয়েকটি চালান ধরা পড়লেও বেশিরভাগ চালান অধরায় নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। এমনটি ভাষ্য সংশ্লিষ্টদের।

শুক্রবার সাগর থেকে ট্রলারসহ ৫ লাখ ও শনিবার টেকনাফের কাটাবনিয়া এলাকা থেকে পরিত্যক্তাবস্থায় ৭ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধারের ঘটনা এসব আশঙ্কার সত্যতা মিলাচ্ছে।

এছাড়া টেকনাফ স্থলবন্দরের কাঠবোঝাই ট্রাক ও পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যানেও ইয়াবার চালান পাচার হচ্ছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য দিয়েছে। সদ্য বিদায়ী বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম নগরীর নতুন ফিশারিঘাট এলাকায় মাছবোঝাই কাভার্ডভ্যান থেকে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ হওয়ার পর এ তথ্যেরও সত্যতায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সূত্র মতে, ৫ জানুয়ারি সাগর পথে পাচারকালে প্রায় বিশ কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা বড়িসহ ফিশিং ট্রলার জব্দ করেছে র্যাব-৭ এর সদস্যরা। এসময় ইয়াবা পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ৮ মাঝিমাল্লাকে গ্রেফতার করা হয়।

অপরদিকে, ৬ জানুয়ারি ভোররাতে টেকনাফ কাটাঁবনিয়ার পুরাতন মেরিনড্রাইভ সড়ক এলাকায় অভিযান চালায় ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সাবরাং বিওপির হাবিলদার মো. মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বে বিজিবির একটি টিম। কয়েকজন লোক বস্তা মাথায় নিয়ে আসছে দেখে তাদের দাঁড়াতে বললে তারা বস্তাগুলো ফেলে দৌঁড়ে পাড়ার ভেতর ঢুকে যায়। ঘটনাস্থল হতে বস্তাগুলো উদ্ধার করে ব্যাটালিয়ন সদরে নিয়ে গণনা করে ৭ লাখ ৪০ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য আনুমানিক ২২ কোটি ২০ লাখ টাকা। টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এসএম আরিফুল ইসলাম তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।

আর অক্টোবরের শেষের দিকে ডিবির সাত সদস্যকে ১৭ লাখ টাকাসহ আটকের পর জেলাতে অঘোষিতভাবে পুলিশের ইয়াবাবিরোধী কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। ফলে ইয়াবা পাচারকারী চক্র সড়কপথেও বিনা বাধায় ইয়াবার চালান পাচার করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তাই আগের মতোই ইয়াবা পাচার রোধে পুলিশের বিশেষ টিমের অভিযান সক্রিয় করার দাবি তুলেছেন সচেতন মহল।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত বিভিন্ন সময়ে টেকনাফ স্থলবন্দরের পণ্যবোঝাই যানবাহন হতে টেকনাফ-কক্সবাজার, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট এবং চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক নগরী খাতুনগঞ্জ হতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন বিভাগের সদস্যরা মাদকের চালানসহ চালক-হেলপারদের আটক করতে সক্ষম হয়।

কাঁচা টাকায় আটকরা ভিন্ন মামলায় কারান্তিরণ বা ছাড়া পাওয়ায় স্থলবন্দর ব্যবসার আড়ালে মাদক চোরাকারবারীদের শনাক্তকরণ অন্ধকারেই রয়ে যায়। ফলে পণ্যবোঝাই ট্রলার কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে মাদকের চালান সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অসংখ্য সফল অভিযান চালিয়ে ইয়াবা চোরাচালানীদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছিল। একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা সব অর্জন মেঘে ঢেকে দিয়েছে। এখন প্রতিদিন ইয়াবার চালান যাওয়ার সংবাদ পায়। তবুও হাত দিতে পারছি না।

টেকনাফ উপজেলা কমিউনিটি পুলিশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম সাংবাদিকদের বলেন, স্থলবন্দর কেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায়ীরা খুবই বেপরোয়া। মাদক পাচার রোধে স্থলবন্দরের পণ্যবাহী যানবাহনের ওপর কঠোরতা অবলম্বন করা জরুরি।

টেশনাফ স্থলবন্দর এলাকার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, টেকনাফ বন্দরের ব্যবসায়ীরা মাদক ব্যবসায় জড়িত নয়। কিছু গাড়ির মালিক ও চালক-হেলপারের যোগসাজশে বন্দরের পণ্যবোঝাই গাড়িতে মাদকের চালান উঠছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেন, স্থলবন্দর কেন্দ্রিক মাদক ব্যবসার বিষয়টি শুনে আসলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়ায় জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, প্রতিটি সীমান্ত এলাকার বড় সমস্যা মাদক চোরাচালান। টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তেও একই সমস্যা মোকাবেলা করছি আমরা। অন্য সীমান্তের চেয়ে দেশের দক্ষিণ সীমান্তে বিশাল জলরাশি হওয়ায় এখানে কৌশল পাল্টানোর পথ অনেক। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে শতভাগ সফলতা আসে না।

সায়ীদ আলমগীর/এমএএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :