শেষ সম্বল বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৫০০ টাকার চেক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ০৭:১৩ পিএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৮

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার মৌজাথানা (আকন্দপাড়া) এলাকার প্রয়াত নুরুল ইসলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে সম্মুখ সমরে আহত হলেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তার নাম স্থান পায়নি।

সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে আপন ছোট ভাই আবু বক্কর ও ভাতিজা আশরাফ আলীকে সঙ্গে নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে রৌমারী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মানকারচরে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে স্বাধীনতার যুদ্ধে যোগ দেন।

স্বাধীনতার পর ভাই ও ভাতিজার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেও বাদ পড়ে যায় নুরুল ইসলামের নাম। স্বাধীনতা যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করতে গিয়ে তার বাম হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন।

তার বীরত্বের জন্য স্বাধীনতাত্তোর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বাক্ষরিত পত্রে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আহত এ মুক্তিযোদ্ধাকে অনুদান হিসেবে ৫০০ টাকার চেক পাঠিয়েছেন। যার স্বারক নং-প্রত্রাক-০৬/০৪/৭২/সিডি-১১০৬। চেক নং-সি,এ-০১৬৭৭৩। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের নাম আজও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়নি। আজো ঘরে পড়ে আছে বঙ্গবন্ধুর দেয়া সেই চেক।

এ ব্যাপারে মৃত নুরুল ইসলামের স্ত্রী আবেদা খাতুন জানান, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করেও তার জীবদ্দশায় তিনি তার নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেননি। যুদ্ধকালীন তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ক্ষণিকের জন্য আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যুদ্ধে যেতে বারণ করলেও তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার প্রত্যয়ে আমার কাছে শেষবিদায় নিয়ে পরিবার-পরিজন ছেড়ে আবারও আহত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যান।

দেশ স্বাধীন হলে তিনি রাজস্ব বিভাগের সহকারী তহশিলদার পদে চাকরিতে ফিরে যান। রংপুর জেলার গঙ্গাছড়া উপজেলার গজঘণ্টা এলাকায় চাকরিকালীন অনুদানের চেক ও কৃতজ্ঞতার চিঠি হাতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুল ইসলাম।

তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে নুরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘এটি টাকার চেক নয়, এটি আমার তাজা রক্ত ঝরানোর সনদ। এটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাকে ও আমার পরিবারকে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে দিয়েছেন। যা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

এদিকে, স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের আহত হওয়া ও বঙ্গবন্ধুর অনুদানের চেক প্রাপ্তির বিষয়টি অবহিত আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চিলমারী কমান্ডের কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মহসিন আলী, মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী সরকার (বীর বিক্রম) ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কুড়িগ্রাম কমান্ডারের মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম টুকু।

নুরুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে উপজেলা কমান্ড চিলমারী কমান্ডার আলহাজ নজরুল ইসলাম (যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষক) বলেন, নুরুল ইসলাম রৌমারীতে আমার কাছে শর্ট-প্রশিক্ষণ নেয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে মানকারচর ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে তিনি তৎকালীন ১১নং সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার আবুল কাশেম চাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন অপারেশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় না থাকায় গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন আলহাজ নজরুল ইসলাম।

১১নং সেক্টরের প্লাটুন কমান্ডার ও প্রশিক্ষক এমএফ সোলাইমান হোসেন বলেন, রৌমারী প্রশিক্ষণ শিবিরে নুরুল ইসলাম দক্ষতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং যুদ্ধকালীন আহত হওয়ার বিষয়টি আমি জানতাম। পাশাপাশি যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু তাকে অনুদান দিয়েছিলেন বলেও জানতাম। তার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা না থাকাটা দুঃখজনক।

নুরুল ইসলাম জীবিত না থাকলেও তার স্ত্রী-সন্তানরা সংশ্লিষ্ট দফতরে ধরনা দিয়েও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে না পারায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

নাজমুল হোসেন/এএম/আরআইপি/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :