আবারও আশ্রয়হীন হলো দুই সহস্রাধিক পরিবার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ০৫:৫৬ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারানো গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীর বাঁধে আশ্রয় নেয়া দুই সহস্রাধিক পরিবার আবারও আশ্রয়হীন হচ্ছে। থাকার শেষ জায়গাটুকু হারিয়ে গত তিন দিনে চন্ডিপুর ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ী গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার ঘর-বাড়ি সরিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন।

ফলে চরম হতাশা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পরেছেন নিঃস্ব মানুষগুলো। থাকার ব্যবস্থা না করেই তাদেরকে উচ্ছেদ করে দেয়া হচ্ছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জমি থেকে।

gaui

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, প্রকৌশল, চন্ডিপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুন্দরগঞ্জের হরিপুর ইউনিয়ন ও চন্ডিপুর ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ী গ্রামে তিস্তা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ করা হবে। সেই সেতুটির সংযোগ সড়ক দিয়ে একটি রাস্তা শ্রীপুর ইউনিয়নের ধর্মপুর বাজার হয়ে পশ্চিম দিকে গিয়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট বাজারে গিয়ে মিলবে। এতে করে কুড়িগ্রামসহ আশেপাশের জেলাগুলোর মানুষ স্বল্প সময়ে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারবে।

সেই সেতুর সঙ্গে আরেকটি সংযোগ সড়ক উজান বোচাগাড়ী-বেলকা-সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ বাঁধে হবে। তাই এই বাঁধটি মেরামত করে ২৪ ফুট প্রস্থের একটি রাস্তা তৈরি করা হবে। সেজন্য রাস্তাটি প্রস্তকরণের কাজ গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু করা হয়েছে। এখন শুধুমাত্র মাটি দিয়ে প্রস্থকরণ ও পরে পাঁকাকরণ কাজ করা হবে। বাঁধটিতে চন্ডিপুর, কঞ্চিবাড়ী, বেলকা ও দহবন্দ ইউনিয়নের দুই সহস্রাধীক পরিবার বসবাস করে।

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে উজান বোচাগাড়ী গ্রামে গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁধের পাশে ঘরগুলোর দরজা-জানালা, বেড়া, ঘরের চালা খোলা হচ্ছে। যার যা কিছু আছে সেসব মালামাল ভ্যানে করে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গাছপালা-বাঁশঝাড় কাটা হচ্ছে। এক্সক্লেভেটর মেশিন দিয়ে বাঁধের পাশেই জমি থেকে মাটি তুলে বাঁধ প্রস্থ করার কাজ চলছে।

gaui

বাঁধে আশ্রয় নেয়া মানুষরা জানায়, তিস্তা নদীর ভাঙনে বসতভিটা বিলীন হয়ে গেলে উজান বোচাগাড়ী-বেলকা-সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ বাঁধটির দুইপাশে দুই সহস্রাধিক পরিবার আশ্রয় নেয়। এখন আবার সেই জায়গাটুকুও হারাতে হচ্ছে তাদের। তারা আত্মীয়ের বাড়ি, অন্যের বাঁশঝাড়ে পতিত জমি ও রাস্তার ধারে আশ্রয় নেবেন বলে জানিয়েছেন নদী ভাঙনে নিঃস্ব মানুষগুলো।

উজান বোচাগাড়ী গ্রামের আলেক উদ্দিন (৭০) বলেন, নদীগর্ভে বসতভিটা বিলীন হয়ে গেলে চার বছর আগে বাঁধের জমিতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন সেই আশ্রয়ও হারাতে হচ্ছে। কোথায় যাবো, কি করবো, ভেবে পাচ্ছি না। আমাদেরকে কোথাও থাকার ব্যবস্থা না করে দিয়েই উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

একই গ্রামের হালিমা বেগম (৫২) বলেন, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সাত বছর আগে নদী ভাঙনে সব বিলীন হয়ে গেলে বাঁধে আশ্রয় নিই। আমার স্বামী নেই। এখন ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবো ভেবে পাচ্ছি না। ঘর সরাতে হবে, তা আমাদেরকে আগে জানানোও হয়নি। সকালে দেখি মেশিন এসেছে। পরে তড়িঘরি করে ঘর সরিয়ে ফেলি।

চন্ডিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, নদীগর্ভে বসতভিটা হারিয়ে আশ্রয়হীন মানুষগুলো বাঁধের নিচে জমিতে ঘর তুলে আশ্রয় নিয়েছিল। এখন সেখান থেকেও তাদেরকে সরে যেতে হচ্ছে। এই মানুষগুলোর মধ্যে অনেকে অন্যের বাড়ি, আত্মীয়ের বাড়ি, বাঁশঝাড়ে ও রাস্তার পাশে পতিত জমিতে আশ্রয় নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত যারা ঘর-বাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তাদের জন্য এখন একটি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করে পুনর্বাসন করা দরকার।

gaui

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল মুনসুর জাগো নিউজকে বলেন, উজান বোচাগাড়ী গ্রাম থেকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার বাঁধটি ২৪ ফিট প্রস্থ করা হবে। এখন মাটি কাটার কাজ চলছে। পরে পাঁকাকরণ করা হবে। বাঁধের এই রাস্তাটি উজান বোচাগাড়ী গ্রামে নতুন যে একটি সেতু করা হবে সেটার সঙ্গে সংযুক্ত হবে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদে যাওয়ার জন্য বাঁধের এই রাস্তাটি ব্যবহার করা হবে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম গোলাম কিবরিয়া বলেন, কাপাসিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নের চরে আশ্রয়ন প্রকল্প করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদনের পর ঘর প্রস্তুত হলে যাচাই-বাছাই করে তাদেরকে সেখানে থাকতে দেয়া হবে। কেননা অনেকেরই চরেও ঘর রয়েছে। যারা বাস্তুহীন, যাদের জায়গা নেই তাদেরকে সেখানে থাকতে দেয়া হবে।

আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার আপাতত কিছু করার আছে কিনা তাদের জন্য এ বিষয়ে ইউএনও বলেন, আপাতত বাড়ি-ঘর বানানো মুশকিল। বিষয়টাতো অনেক বড়। আমরা প্রস্তাব পাঠিয়েছি, অনুমোদন হলে তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন করে তাদেরকে থাকতে দেয়া হবে।

এসব মানুষদের জন্য গুচ্ছগ্রাম কিংবা আশ্রয়ন প্রকল্প করা যায় কিনা বিষয়টি গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পালকে মুঠোফোনে অবহিত করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমরা যেখানেই সরকারি জায়গা পাচ্ছি সেখানেই করছি। আমরা সরকারি জায়গা পেলে অবশ্যই গুচ্ছগ্রাম করবো। এ ছাড়াও তাদেরকে আরও কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, আমরা দেখবো।

রওশন আলম পাপুল/এমএএস/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।