টার্কি পালনে স্বাবলম্বী খামারিরা
যশোরের শার্শায় পারিবারিক ও বাণিজ্যিকভাবে তার্কি পালন শুরু হয়েছে। বেকারত্ব নিরসনে নতুন দিক উন্মোচন করতে যাচ্ছে তার্কি পালন। দুই যুবক লেখাপড়া শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে টার্কি পালন নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন। এখন তারা স্বাবলম্বী।
দেখতে কিছুটা ময়ূরের মতো। নিজের রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে মাঝে মধ্যে ময়ূরের মতো পেখম মেলে ঘুরে বেড়ায়। একসঙ্গে সবাই ডাকাডাকি করে। খুবই শান্ত প্রকৃৃতির প্রাণি। প্রাণিটির নাম তার্কি। তার্কি মুরগি নামেও পরিচিত।
বাংলাদেশে এ নামটি খুব বেশি পরিচিত না হলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে এ জাতের মুরগির বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। ঝুঁকি ও ঝামেলা কম হওয়ায় শার্শায় বেকার ও শিক্ষিত যুবকরা এখন তার্কি পালনে আগ্রহী হচ্ছেন।
অল্প টাকা বিনিয়োগ করে এক বছরের মধ্যেই দ্বিগুণ মুনাফা দেখতে পারছেন তার্কি খামারিরা। নতুন জন্ম নেয়া বাচ্চা লালন পালন করে মাত্র তিন মাসের মাথায় দ্বিগুণের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করে লাভ পাচ্ছেন খামারিরা।
শার্শার সম্বন্ধকাঠি গ্রামের রাজু হোসেন জানান, লেখাপড়া শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হয়ে তার্কি পালন শুরু করেন। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরপর বিক্রি করা হচ্ছে তার্কি। ১-১০ দিনের বাচ্চা ৩০০ টাকা ও বড় গুলো ৫/৬ হাজার টাকা জোড়া বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া খাবারের খরচও কম। বাড়তি খাবার বাজার থেকে কিনতে হয় না। প্রকৃতিতে এদের খাবার পাওয়া যায়। কলমি, হেলেঞ্চা, সরিষা, পালংকসহ বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি বেশি পছন্দ করে এ জাতের মুরগি।

রাজু বলেন, প্রথমে দেড়শ টাকা দরে ৬০০ ডিম কিনি। ওই ডিমের বাচ্চা ফুটানোর জন্য দেড় লাখ টাকা দিয়ে ইনকিউটেটর কিনে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো শুরু করি। এরপর এর চাহিদা দেখে রাজুকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার পাস করে চাকরি না পেয়ে শার্শার খলিসাখালী গ্রামের সজিব মনোনিবেশ করেন তার্কি পালনে। তিনি জানান, তার্কির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এত বেশি যে জ্বর-ঠান্ডা ছাড়া আর কোনো রোগ আক্রান্ত করতে পারে না। ২০ সপ্তাহ বয়স থেকে তার্কি ডিম দেয়া শুরু করে। ৬ মাসে ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৭-৮ কেজি। প্রতিটি তার্কি পালনে খরচ হয় ৭০০-৮০০ টাকা। আর বিক্রি হয় ন্যুনতম দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মুরগিতে লাভ আসে প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা।
এসব খামারে তার্কি পালন দেখে বেনাপোলসহ শার্শার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ পারিবারিকভাবে তার্কি পালন শুরু করেছে এবং অনেকেই আগ্রহী হয়ে শুরু করেছে তার্কি চাষ।
রাজুর দেখাদেখি আরও অনেকে ছোট ছোট খামার গড়ে তুলছেন। রাজুর খামার থেকে তার্কির বাচ্চা কিনে ঝিকরগাছার মাঠুয়াপাড়ার কামরুল ইসলাম, শিমুলিয়ার মনিরুজ্জামান বিল্লাল ও কামারপাড়ার আবু সাইদ তিন বন্ধু তিনটি খামার গড়ে তুলেছেন।
কামরুল বলেন, তার্কি তৃণভোজি প্রাণি হওয়ায় এরা লতাপাতা ও ঘাস খায়। এদের রোগবালাইও কম। নতুন খামার তৈরি করেছি, তার্কির সংখ্যা বাড়াতে পারলে বেশি লাভ হতো। কিন্তু অর্থ সংকটে এগোতে পারছি না। সরকারি সহযোগিতা পেলে খামারটি বড় করা সম্ভব হতো।

মনিরুজ্জামান বিল্লাল বলেন, রাজুর খামার থেকে ৩৬ দিনের ৩৮টি তার্কির বাচ্চা কিনে প্রথম খামার শুরু করি। দুই মাসের প্রতিটি বাচ্চার ওজন এখন আড়াই কেজি হয়েছে। ওদের জন্য দু’কাঠা জমিতে ঘাস লাগাইছি।
শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জয়দেব কুমার সিংহ জানান, রাজু, সজিবসহ অন্যান্য খামারিরা খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। আর এ পুষ্টির উৎস হিসেবে তার্কির গুরুত্ব মুরগি ও হাঁসের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। তার্কির মাংস চর্বি বিহীন হওয়ায় সারা পৃথিবীতে এ মাংস অত্যন্ত জনপ্রিয়।
মোঃ জামাল হোসেন/এএম/আরআইপি