আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন : জাফর ইকবাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট
প্রকাশিত: ০৯:০৯ পিএম, ১৪ মার্চ ২০১৮ | আপডেট: ০৯:১৮ পিএম, ১৪ মার্চ ২০১৮

দীর্ঘ ১১ দিন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বুধবার দুপুরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছেন জনপ্রিয় লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাকে বরণ করে নিতে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ‘সাধাসিধে কথা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষকসহ মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জাফর ইকবাল বলেন, আমাকে নাস্তিক বলা হয়। অথচ পবিত্র কুরআনের প্রথম লাইন থেকে শেষ লাইন আমি যেভাবে ভালোবেসে গভীরভাবে পড়েছি আমার মনে হয় না দ্বিতীয় কেউ সেভাবে পড়েছেন। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। নিশ্চয় তিনি আমাকে দিয়ে ভালো কিছু করাতে চান। তিনি আমাকে মায়া করেছেন।

জনপ্রিয় এই লেখক তার বক্তৃতায় একাধিকবার পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃতি করেন। তার ওপর হামলাকারী ফয়জুল হাসানসহ বিপথে যাওয়া তরুণ সমাজের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তুমি যদি একটা মানুষকে হত্যা করো তবে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করলে। কুরআন শরিফে এই মহান বাণী রয়েছে। যারা তোমাকে বুঝাচ্ছে তারা বিভ্রান্ত করছে। তোমরা যদি একটা মানবজাতিকে বাঁচাও তবে সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচালে। যারা ছুরিকাঘাতের পর আমাকে এখান থেকে তুলে হাসপাতালে পাঠিয়েছ তারা শুধুই আমাকে বাঁচাওনি সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচিয়েছ। আমি তোমাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি সিএমএইচ ও ওসমানী হাসপাতালের চিকিৎসকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি ধন্যবাদ জানাচ্ছি অন্যান্যদের।

জাফর ইকবাল বলেন, যে যুবক আমার ওপর হামলা করেছে তার জন্য আমার কষ্ট হয়। আমার মায়া হয়। কারণ সে বিভ্রান্তির পথে রয়েছে। নিশ্চয় এ পথে সে একা নয়। আরও অনেকেই এ পথে রয়েছে। আমার মনে হচ্ছে আজকের অনুষ্ঠানে এ রকম বিপথগামী দু-একজন আছে। যারা আমাকে আবারও হত্যা করতে চাচ্ছে।

আমাকে মেরে যুবকটি বেহেশতে যেতে চেয়েছিল জানিয়ে হামলাকারীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তোমাকে যে মারতে পাঠিয়েছে, তার ছেলে-মেয়েরা হয়তো লেখাপড়া করছে। আর তোমার অবস্থা কী? দেখ বাবা-মা ও স্বজনরা রিমান্ডে। হামলাকারীর দলের কেউ হয়তো এখানে দাঁড়িয়ে কথা শুনছে। তাদের বলি, তোমাদের কোনো কিছু জানা, বোঝার থাকলে আমার সঙ্গে দেখা করো। কথা বল।

jagonews24

জাফর ইকবাল বলেন, তাদেরকে বলছি, যারা আমাকে হত্যা করতে চাও তোমরা আমার বিভাগে সরাসরি আস। আমি তোমাদের কিছুই করবো না। শুধু ছুরিকাঁচি রেখে আস। আমার সঙ্গে কথা বল, কী কষ্ট তোমাদের মধ্যে মানুষ হত্যা করতে চাও। এই সুন্দর পৃথিবীতে সুন্দরভাবে বসবাস করতে না চাওয়ার কারণ কী? আমি জানতে চাই।

তিনি বলেন, তোমরা আমার সামনা-সামনি বসে কথা বল। তোমাদের বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। অন্যথায় তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারাগারে যেতে হবে। রিমান্ডে যেতে হবে। সাজা ভোগ করতে হবে।

এরপর তিনি নিজ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি দূরে থাকায় তোমাদের কোর্সের অনেক ক্ষতি হয়েছে। সেটি আমি পুষিয়ে দেব। আমার ওপর হামলার পর তোমরা যেভাবে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করেছ, যেভাবে রাজপথে দাঁড়িয়েছ সেরকমই আমি চেয়েছিলাম। তোমাদের ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই।

জাফর ইকবাল আরও বলেন, দেশের মানুষ, আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে কতটা ভালোবাসা দিয়েছে তা আমি ফিরিয়ে দিতে পারব না। আমি তাদেরকে আজীবন ভালোবাসব। আমি জানি না তোমাদের এমন ভালোবাসার প্রতিদান কীভাবে দিব।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ, জাফর ইকবালের স্ত্রী ড. ইয়াসমীন হক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবেদ খান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. রেজা সেলিমসহ ।

এছাড়া আরও পাঁচজন শিক্ষার্থী জাফর ইকবালকে নিয়ে তাদের স্বপ্নের কথা শোনান। কীভাবে জাফর ইকবাল তাদের জীবনে আইকন হলে সেই গল্প শোনান।

প্রসঙ্গত, গত ৩ মার্চ বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায় ফয়জুর রহমান নামে এক যুবক। জাফর ইকবালকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার শেষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

ছামির মাহমুদ/আরএআর/আরআইপি