খুনের আগে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় বাবু সোনাকে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক রংপুর
প্রকাশিত: ০১:৫৮ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০১৮ | আপডেট: ০৩:৪৩ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০১৮
খুনের আগে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় বাবু সোনাকে

রংপুরের বিশেষ জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও আওয়ামী লীগ নেতা রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনাকে (৫৮) হত্যার পরিকল্পনা করা হয় দুই মাস ধরে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নিখোঁজের একদিন আগে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ভাত ও দুধের সঙ্গে ১০টি ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় বাবু সোনাকে। ট্যাবলেট খাওয়ানোর পর অচেতন হয়ে পড়লে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাকে।

মঙ্গলবার রাতে নগরীর তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার একটি নির্মাণাধীন বাড়ির ঘরের মেঝে খুঁড়ে মরদেহ উদ্ধারের পর বুধবার দুপুর ১২টায় র‌্যাব-১৩ এর কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ।

তিনি জানান, বাবু সোনা নিখোঁজের পর শনিবার কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। ওই জিডির সূত্র ধরে র‌্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে বাবু সোনার ছোটভাই সুশান্ত ভৌমিক সুবল রোববার থানায় একটি মামলা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে বাবু সোনার স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার দীপা ওরফে দীপা ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব আটক করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি এ হক্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন এবং মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে জানান।

র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপা জানিয়েছেন পরকীয়া প্রেম, পারিবারিক কলহ, সন্দেহ ও অশান্তি থেকেই স্বামী বাবু সোনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। হত্যার পরিকল্পনা করা হয় দুই মাস আগে থেকে। আর এ হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেন একই স্কুলের শিক্ষক ও তার প্রেমিক কামরুল ইসলাম।

দীপার স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক আরও জানান, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে বাবু সোনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান কামরুল। সকাল ৯টার দিকে তিনি একটি ভ্যান নিয়ে আসেন। মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে নিহতের স্ত্রী দীপা আলমারি পরিবর্তনের কথা বলে কামরুলের সহায়তায় বাবু সোনার মরদেহ আলমারিতে ভরেন। পরে তিন ব্যক্তির সহায়তায় ওই মরদেহ ভ্যানে তুলে তাজহাট মোল্লাপাড়ার নির্মাণাধীন ওই বাড়িতে পুঁতে রাখা হয়। ভ্যানে তোলার কাজে সহায়তাকারী তিন ব্যক্তিকে কামরুল মাস্টার তার সঙ্গে নিয়ে আসেন।

পরে তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী মোল্লাপাড়ার রবিউল ইসলামের ছেলে সবুজ ইসলাম (১৭) ও রফিকুল ইসলামের ছেলে রোকনুজ্জামান (১৭) গর্তের মাটি ভরাটে সহায়তা করেন।

ওই দুই শিক্ষার্থীর স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক জানান, ২৬ মার্চ শিক্ষক কামরুল ইসলামের নির্দেশে ৩০০ টাকার বিনিময়ে তারা গর্ত খুঁড়ে রাখেন। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বালু দিয়ে গর্ত ঢেকে রাখেন। কামরুল তাদের শিক্ষক হওয়ায় তার আদেশ পালন করেছেন তারা।

এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান এবং দীপা ও দুই শিক্ষার্থীকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার কথাও জানান র‌্যাব মহাপরিচালক।

এদিকে সোমবার কামরুল ও মতিয়ারকে আটক করা হলেও তখন কিছু জানায়নি পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাদের আটকের কথা স্বীকার করেন কোতোয়ালি থানার ওসি বাবুল মিঞা।

এর আগে নিখোঁজের ৫ দিন পর মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে নিজ বাড়ি তাজহাট বাবুপাড়া থেকে আধা কিলোমিটার দূরে তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার শিক্ষক কামরুল ইসলামের ঢাকায় বসবাসরত বড় ভাইয়ের নির্মাণাধীন বাড়ির মাটির নিচ থেকে বাবু সোনার মরদেহ উদ্ধার করে র‌্যাব। পরে তা শনাক্তের জন্য বাবু সোনার ছোটভাই সুশান্ত ভৌমিক সুবল ও স্ত্রী দীপাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা গিয়ে বাবু সোনার মরদেহ শনাক্ত করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামরুল ইসলামের পৈত্রিক নিবাস তাজহাট মোল্লাপাড়ায়। তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নগরীর রাধাবল্লভ এলাকায় বসবাস করলেও মোল্লাপাড়ার বাড়িতেও নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সেখানে তার জমিজমা ও বাগান রয়েছে।

jagonews24

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই বাগানের মধ্যে দুটি বিশাল আকারের গর্ত খোঁড়া রয়েছে। প্রতিবেশিরা জানান এক মাস আগে ওই গর্ত দুটি খুঁড়েছেন তিনি। তবে কী কারণে তা খুঁড়েছেন তা কেউ বলতে পারেন না।

গত শুক্রবার সকাল থেকে নিখোঁজ ছিলেন বাবু সোনা। ওইদিন তার স্ত্রী বলেছিলেন, বাবু সোনা সকাল ৬টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যান। কোথায় গিয়েছেন সে বিষয়ে বাড়িতে কাউকে কিছু বলেননি। দীপা ভৌমিকের এমন বক্তব্যের পর মঙ্গলবার তারই স্বীকারোক্তিতে মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়।

অ্যাড. রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা চাঞ্চল্যকর জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যাকাণ্ডের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ছিলেন।

এছাড়াও রংপুর আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সহ-সাধারণ সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রংপুর বিভাগের ট্রাস্ট্রি, পূজা উদযাপন পরিষদের রংপুর জেলার সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।

ব্যক্তি জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা ছিলেন বাবু সোনা। ছেলে দীপ্ত ভৌমিক রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এবং মেয়ে অনিকা ভৌমিক রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

জিতু কবীর/এফএ/আরআইপি