মৌলভীবাজারে সরকারি কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতা
কমছে মনু নদের পানি। বিপদসীমার ১৮০ সেন্টিমিটার থেকে কমে ৬৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে মনু নদের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু বন্যা কবলিত এলাকায় কমছে না দুর্ভোগ। সরকার চাহিদার তুলনায় দিগুণ সেবা দিতে রাজি থাকলেও কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। কাগজে কলমে তারা বন্যাদুর্গতদের নিয়ে কাজ করার হিসেব দিলেও বাস্তবে তার চিত্র উল্টো।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. আবু জাহের জানান, বন্যাদুর্গত এলাকায় ৭৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের আজিজুর রহমান বুলু জানান, বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজ করছি কিন্তু গত ৬ দিনে কোথাও কোনো মেডিকেল টিম দেখিনি।
রাজনগর উপজেলার আশ্রাকাপন গ্রামের বন্যাকবলিত গ্রামের ছাইদুল ইসলাম জানান, মেডিকেল টিমের কথা শুনেছি তবে বাস্তবে দেখিনি।
এদিকে চাহিদার তুলনায় মানুষ ত্রাণ কম পাচ্ছে অথচ সরকারি কর্মকর্তাদের অবহেলায় নষ্ট হয়েছে ত্রাণ। মৌলভীবাজার পৌরশহরে শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করায় খাদ্য গুদামের ৫৫০ টন চাল-গম পানিতে ভিজে গেছে খাদ্য কর্মকর্তাদের উদাসীনতায়। অথচ পানি প্রবেশ করার ৪ দিন আগে থেকেই সারা শহরে মানুষ ছিল সতর্ক। ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু জেলা খাদ্য গুদামের ইনচার্জ মো. সাখাওয়াত হোসেন ও জেলা খাদ্য কর্মকর্তার মনোজ কান্তি দাস চৌধুরীর ঘুম ভাঙে আড়াই কোটি টাকার চাল ও গম জলে ভেজার পর। অথচ ২ দিন আগেই মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম তাদেরকে এ ব্যপারে সতর্ক করেছিলেন।
জেলা প্রশাসকের হিসেব মতে, জেলায় আউশ ধান নষ্ট হয়েছে ২ হাজার ৯৬০ হেক্টর কিন্তু জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শাহাজান জানিয়েছেন এক হাজার ৫০০ হেক্টর। জেলা কর্মকর্তা হয়েও উনার কাছে ফসলের হিসেব নেই।
জেলার বিভিন্ন স্কুলে ৬০টির মত আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে কিন্তু জেলা শিক্ষা অফিসার একটি স্কুলও সরেজমিনে দেখেননি। বন্যাকবলিত মানুষ কয়টা স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে তা নিয়ে তার কাছে কোনো হিসেব নেই। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ১০০ টি আশ্রয় কেন্দ্র আছে। তবে নাম জানতে চাইলে তিনি একটি স্কুলের নামও বলতে পারেননি।
সরকারি হিসেবে মোলভীবাজার জেলায় প্রায় দুই লাখ লোক পানিবন্দি অথচ সিভিল সার্জন ডা. মো. আবু জাহের জানিয়েছেন, তারা ১০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিলি করেছেন। মজুদ আছে আরও ছয় হাজার।
দুই লাখ লোকের পানির চাহিদায় যা খুব সামান্য। অথচ আগে থেকেই বারবার সতর্ক করা হলেও সরকারের কাছে কোনো চাহিদাপত্র তারা পাঠাননি। যে ১০ হাজার বিলি করেছেন তারও কোনো দেখা নেই।
রজমিনে জেলার কমলগঞ্জ ও রাজনগর উপজেলা ঘুরে অন্তত ২০ জন বন্যা কবলিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা কেউই পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাননি।
রাজগর উপজেলার মনসুরনগর ইউনিয়নের প্রেমনগর গ্রামের দুলু মিয়া ও মুহিত মিয়া জানান, তারা বাধ্য হয়ে জীবন বাঁচাতে বন্যার পানি খাচ্ছেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের উদাসীসনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। সদর উপজেলার মিরপুর গ্রামের বদরুল ইসলাম বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আচরণ বন্যা প্লাবিত এলাকার মানুষের সঙ্গে উপহাস। যা ক্ষমার অযোগ্য।
সরকারি কর্মকর্তাদের এমন অবহেলার কথা স্বীকার করেছেন খোদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। সোমবার মৌলভীবাজারে তিনি জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সভায় একে একে ওপরে উল্লিখিত বন্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাজ সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং কাজের বিবরণ শুনে উষ্মা প্রকাশ করেন।
রিপন দে/আরএআর/জেআইএম