হয়তো আর দেখা হবে না...

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৫:৪৬ পিএম, ১৭ জুলাই ২০১৮ | আপডেট: ০৫:৪৭ পিএম, ১৭ জুলাই ২০১৮

আনোয়ার হোসেন চকরিয়ার নাম করা বিত্তশালী। জড়িত রয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়। রয়েছেন চকরিয়া গ্রামার স্কুল ম্যানেজিং কমিটিতেও। তদারকি রাখেন সন্তানদের পড়ালেখায়। তার বড় ছেলে আমিনুল হোসাইন এমশাদ চকরিয়া গ্রামার স্কুল থেকে পিইসি ও জেএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পায়।

সেই ধারাবাহিকতা ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায়ও ধরে রাখার প্রত্যয়ে চট্টগ্রাম শহরের প্রসিদ্ধ এক কোচিং সেন্টারে ছেলে এমশাদকে ভর্তি করিয়ে দেন বাবা আনোয়ার হোসাইন। তার জন্য চকবাজারে বাসাও নেন বাবা। ১৪ জুলাই অর্ধ-বর্ষ পরীক্ষা শেষে সোমবার চট্টগ্রামের বাসায় ওঠার কথা ছিল এমশাদের।

কিন্তু দীর্ঘ ১২ বছরের সহপাঠীদের ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে যেতে হবে, এটি কেমন যেন ভোগাচ্ছিল এসএসসি পরীক্ষার্থী এমশাদকে। তাই ১৪ জুলাই অর্ধ-বর্ষ পরীক্ষা শেষে বাসাই এসে সহপাঠী বন্ধুদের উদ্দেশে নিজের খাতার একটি ছেঁড়া পাতায় মনের জমানো কষ্টগুলো ব্যক্ত করে সে। এ চিঠি লেখার কয়েক ঘণ্টা পর সহপাঠীদের সঙ্গে ফুটবল খেলে মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে সলিল সমাধি ঘটে তার। তার সঙ্গে সহোদরসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের হারিয়ে শোকে বিহবল বাবা-মা, স্বজনরা। কলিজার ধনদের ব্যবহার্য্য দ্রব্যাদি নেড়ে চেড়ে দেখছেন অভিভাবকরা। এভাবে করতে গিয়ে বন্ধুদের ছেড়ে যেতে এমশাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ব্যক্ত করা সেই চিঠি খুঁজে পেয়ে মা নার্গিস আক্তার, বাবা আনোয়ারসহ পরিবার সদস্যরা কেবল কাঁদছেন।

গত শনিবার বিকেলে মাতামুহুরী নদীর চোরাবালিতে সলিল সমাধি হওয়া এমশাদ সহপাঠী বন্ধুদের উদ্দেশে ছেঁড়া কাগজের চিঠিতে লেখে, ‘জানি না হায়াত কত দিন আছে। হয়ত আজ আছি কাল নেই। তবু যতদিন বাঁচব তোদের সবাইকে সাথে নিয়ে বাঁচব। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১২টি বছর তোদের সাথে আছি। হয়ত আর দেখা হবে না। কিন্তু আমি তোদের কোনো দিন ভুলব না। এসএসসির পরেও তোদের সাথে যোগাযোগ থাকবে। তোরাও আমার সাথে যোগাযোগ রাখিস। তা না হলে খুব একা হয়ে যাব। ছেলেদের মধ্যে ১ম বেঞ্চের ৪ জন আমার বয়ফ্রেন্ড। আর গার্লফ্রেন্ডের মধ্যে রিতু। কোথাও চলে গেলে যাই হোক না কেন যোগাযোগ বন্ধ করিস না। ১২ বছর তোদের সাথে অনেক ঝগড়া করেছি, খুব মজা পাইছি। ১২ বছর তোদের সাথে খুব সুন্দরভাবে কাটিয়েছি। এই সুন্দর মুহূর্তগুলো আমার জীবনে আর কোনোদিন আসবে না। আমি নিয়মিত নামাজ ও কুরআন পড়ি। আর চেষ্টা করব তা ধরে রাখার জন্য। এসএসসির পরে তোদের জন্য একটা বার্থ ডে ট্রিট থাকবে, চিন্তা করিস না।’

মর্মস্পর্শী এই চিঠিটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর এমশাদ মৃত্যুকে দেখেই খেলতে গিয়েছেসহ নানা মন্তব্য করে বেদনা ও নিহতদের জন্য দোয়া জানাচ্ছেন লোকজন।

চকরিয়া পৌরশহরের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসাইন বন্ধুদের উদ্দেশে ছেলে এমশাদের লেখা চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, কোনোদিন কল্পনাও করিনি বুকের ধন দুই মানিক একদিনেই আমাদের ছেড়ে যাবে। মনে আশা ছিল দুই ছেলের কাঁধে চড়ে আমি কবরে যাব। কিন্তু আল্লাহ আমাকে দিয়েই আমার দুই ছেলেকে কবরে মাটি দেয়ালো।

মর্মান্তিক এ সলিল সমাধিতে দুই ছেলেকে হারিয়ে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন মা নার্গিস আক্তার। স্বজনরা চেষ্টা করেও তাকে শান্তনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যাকেই দেখছে শুধু বলছেন, ‘আমার মানিকজোড়কে এনে দাও। আল্লাহ এভাবে কেন তাদের কেড়ে নিল?’

এমশাদের চাচা ব্যবসায়ী জমির হোসাইন বলেন, ভাতিজাদের দাফন শেষে বাড়িতে এসেই দেখি ভাবি (এমশাদ ও মেহরাবের মা) ছেলেদের বই-খাতা ঘাঁটছেন। এ সময় এমশাদের একটি খাতা থেকে কি যেন বের করে পড়েই ডুকরে কেঁদে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তখন দৌঁড়ে ভাবিকে তুলতে গিয়ে তার হাতে পাই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ার মতো এমশাদের সেই চিঠি। চিঠি পড়ে আমরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।

চকরিয়া গ্রামার স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, পিইসি ও জেএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাসসহ দুই পরীক্ষায় বৃত্তিও পেয়েছিল আমিনুল হোসাইন এমশাদ। তার ছোট ভাই মেহরাব হোসাইনও পড়ালেখায় বেশ মেধাবী।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, এটি সত্যিই হৃদয়বিদারক। এভাবে চোখের সামনে তরতাজা কিশোর প্রাণ নিথর হওয়া কেউ স্বাভাবিকভাবে মানতে পারে না। এরপরও সোমবার রাতে আমরা শোকাহত আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছি। তাদের শোকের ভেতর আরও বেদনা বাড়িয়েছে এমশাদের লেখা সেই চিঠি। কচি হাতের লেখাগুলো বুকে বিধছে।

উল্লেখ্য, শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ও চকরিয়ার চিরিঙ্গা আনোয়ার শপিং কমপ্লেক্স এর মালিক আনোয়ার হোসাইনের দু’ছেলে আমিনুল হোসাইন এমশাদ এবং অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহরাব হোসেন, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও পৌর শহরের হাসপাতাল পাড়ার মো. শওকত আলীর ছেলে ফরহাদ বিন শওকত, চকরিয়া গ্রামার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের ছেলে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সায়ীদ জাওয়াদ অরভি ও একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক জলি ভট্টাচার্য ও কক্সবাজার সদরের ব্যবসায়ী কানু ভট্টাচার্যের ছেলে তুর্ণ ভট্টাচার্য মাতামুহুরীর চরে ফুটবল খেলা শেষে নদীতে গোসল করতে নেমে চোরাবালিতে আটকে গিয়ে নিখোঁজ হয়। পরে দীর্ঘ তল্লাশির পর পৃথক সময়ে ওইদিন রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সময়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। রোববার নদীর চরেই জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়েছে।

সায়ীদ আলমগীর/আরএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :