মহিষের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ঘিরে উপকূলে সম্ভাবনা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লক্ষ্মীপুর
প্রকাশিত: ০৭:০৫ পিএম, ১২ আগস্ট ২০১৮

দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মহিষের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। উপকূলের জনগোষ্ঠী ও সমবায় কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে এ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার।

এর জন্য বাংলাদেশে প্রথম ভারত থেকে বৈধভাবে মহিষ আমদানি করেছে। উন্নতজাতের এসব মহিষ প্রজননের মাধ্যমে উপকূলের চরাঞ্চলে ব্যাপকহারে মহিষের উৎপাদন বাড়বে। এতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বদলে যাবে এ জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার মান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয়ে রায়পুরে মহিষের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের কাজ করা হয়।

এর মধ্যে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটে একটি উপকেন্দ্রও (শুধু খামার) রয়েছে। ব্যয়ের অর্থের মধ্যে সরকার ১৩ কোটি ১৩ লাখ ৪৭ হাজার এবং ৫ কোটি ১১ লাখ টাকা মিল্কভিটা অনুদান দিয়েছে। ভারত থেকে বৈধভাবে রায়পুর কেন্দ্রে গত ৩১ ডিসেম্বর ও ১০ মে মুররাহ জাতের ৮৭টি মহিষ ও ৫০টি বাচুর আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ২৭টি মহিষ গর্ভবতী। মুররাহ’র মধ্যে উন্নত জাতের ৫টি মহিষ রয়েছে। এ কেন্দ্রে আরও ১০০ মহিষ আমদানি করা হবে।

southeast

ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, মহিষকে ঘাসের পাশাপাশি দানাদার খাবার সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে গমের ভুসি, চালের কুঁড়া, ভুট্টা, সয়াবিন খৈল, তিলের খৈল, খেসারির ভুসি, ক্যালসিয়াম পাউডার ও ভিটামিন মিনারেল প্রিমিক্স রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেঘনা উপকূলীয় চরাঞ্চল মহিষ চাষের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশে খাবারের চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করা মুররাহ জাতের মহিষ দিনে ৭ লিটার দুধ দেয়। কিন্তু উন্নতমানের গো-খাদ্য সরবরাহ করায় অন্যান্য দেশে এসব মহিষ ১৫ থেকে ২০ লিটার দুধ দেয়। দেশীয় জাতের মহিষ দৈনিক দুধ দেয় ২ লিটার। নেপালে ৭০, পাকিস্তানে ৬৩ ও ভারতে ৫৩ শতাংশ মুররাহ জাতের মহিষ থাকলেও বাংলাদেশে তা রয়েছে শতকরা ৩ শতাংশ।

২০১৫ সালের ১২ জুন মিল্কভিটার অধীনে দুধ শীতলীকরণকেন্দ্র (সিমেন প্রসেসিং ল্যাবরেটরি) নির্মাণ করা হয়। এর উৎপাদিত দুধ শীতলীকরণ করে সড়কপথে ঢাকার মিরপুরে পাঠানো হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার রায়পুর, সদর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার চরগুলোতে বিপুল পরিমাণ সরকারি খাস জমি রয়েছে। এসব খাস ও ব্যক্তিমালিকানা জমিতে অর্ধশতাধিক মহিষের খামার গড়ে উঠেছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মহিষ পালনের সঙ্গে বিপুল সংখ্যক রাখাল নিয়োজিত রয়েছে। এর প্রসারে কৃষকদের বাণিজ্যিকভাবে ঘাস চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের এখনো এ বিষয়ে সঠিক ধারণা নেই। তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে এই কেন্দ্রের মহিষের খাদ্য ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষকরাও লাভবান হবেন।

southeast

এছাড়া মহিষের দুধে তৈরি দধি সুস্বাদু হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এর ব্যাপক কদর রয়েছে। স্বল্পখরচে মহিষের খামার স্থাপন ও পালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উপকূলের হাজারো নারী-পুরুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন। অন্যদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের ওয়েব সাইটে উল্লেখ রয়েছে, লক্ষ্মীপুরে ১৪ হাজার ২৮৮টি মহিষ রয়েছে।

রামগতি উপজেলা মহিষ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদ মোল্লা বলেন, মহিষ পালন করে রাখালরা জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সরকারিভাবে চরে পর্যাপ্ত কিল্লা নির্মাণ ও খামারিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে মহিষ পালনে সহায়ক হবে।

রায়পুরে মহিষের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. ফরহাদুল আলম বলেন, আমাদের সমবায়ীদের উন্নতজাতের এসব মহিষ দেয়া হবে। দুধ ও মাংসের উৎপাদনে নতুন বিপ্লব ঘটবে। এতে সমবায়ীরা চরে গাভির পাশাপাশি মহিষ পালন করেও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবেন।

southeast

জানতে চাইলে রায়পুর মহিষ প্রজনন কেন্দ্র ও দুগ্ধ উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক প্রিতম কুমার দাস বলেন, মহিষের মাংস ও দুধ স্বাস্থ্যসম্মত। মহিষ বিচরণ প্রিয় প্রাণি। মহিষের জন্য খোলা মাঠ প্রয়োজন। একটি মহিষের জন্য প্রতিদিন ২০ কেজি ঘাসের প্রয়োজন। জমি ও ঘাস চাষের ব্যবস্থা না থাকায় পরিমাণ মতো খাবার উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। খাবারের চাহিদা মেটাতে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলো থেকে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি খড় কিনে আনতে হয়।

তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুরের উপকূলে অনেক খাসের জমি রয়েছে। আমাদের বর্তমানে ভূমি ও ঘাস সংকট রয়েছে। কেন্দ্রের আশপাশে ১০ একর অথবা দুর্গম চরে ৫০ একর খাস জমির জন্য জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাবনা দেয়া হবে। এটি এই প্রকল্পের প্রসার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।

এএম/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :