কক্সবাজারে ভালো নেই প্রবাসীদের পরিবারগুলো

সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১০:০৩ এএম, ২১ আগস্ট ২০১৮
ফাইল ছবি

প্রবাসে ধরপাকড় ও কর্মহীনতায় আয় কমার প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের কোরবানির ঈদে। পূর্বের কোরবানির ঈদে প্রবাসীর পরিবারগুলো একক পশু কোরবানি দিলেও চলতি কোরবানিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগে কোরবানি দিচ্ছে প্রায় পরিবার। প্রবাসে আয় কমার পাশাপাশি বাজারে কোরবানি পশুর বাড়তি দামকেও এ জন্য দায়ী করছেন বোদ্ধা মহল।

কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলহাজ ছৈয়দ আলম বলেন, জেলার বৃহত্তর ঈদগাঁওর অধিকাংশ পরিবারের লোকজন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে। প্রায় প্রবাসীর পরিবার প্রতিবছর একক পশু কোরবানি দিয়ে এসেছে। কয়েক দশক ধরেই এ ধারা চলে এলেও চলতি বছর তাতে ঘটেছে ব্যত্যয়। হাতেগোণা কয়েকজন ছাড়া বাকিরা অংশীদার ভিত্তিতে কোরবানি দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, এর কারণ খোঁজতে গিয়ে জেনেছি মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ (দুবাই) প্রায় সব দেশেই বৈধ-অবৈধ সব ধরনের প্রবাসীরা কাজ ও মুজুরি নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে। এছাড়া সৌদি আরব ও দুবাইতে কাজের পারমিটের (আকামা) মেয়াদ বাড়াতে কপিলরা বিশাল অংকের টাকা দাবি করছেন। এতে অনেক প্রবাসীর জন্য এখান থেকেই টাকা পাঠাতে হচ্ছে।

তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সৌদি আরব প্রবাসী ঈদগাঁওর গিয়াস উদ্দিন, চৌফলদন্ডীর শাহজাহান মনিরসহ আরও বেশ কয়েকজন। তারা জানান, কাজের ধরন ভেদে একেকটি ভিসা নবায়ন করতে ৪ হাজার থেকে ১২ হাজার রিয়াল (সৌদি বিনিময় অর্থ) দাবি করছেন কপিলরা। কপিল থেকে ভিসা নিয়ে বাইরে ফ্রি (যেখানে ইচ্ছে কাজ করা) কাজ করা ভিসাধারিরা এ ভোগান্তিতে পড়েছেন। সৌদি আরবে বৈধ অভিবাসীর মাঝে এ রকম ভিসাধারী লোক বেশি। আর যারা ওমরাহ করতে এসে চুরি করে থেকে গেছেন তাদের এ ভোগান্তি না থাকলে আয়হীন থাকছেন তারা। এক সময় ভালো আয় করলেও এখন প্রতিটি কাজে সৌদি স্থানীয় নাগরিকরা অংশ নেয়ায় তাদের পর্যাপ্ত আয়ে ছেদ পড়েছে।

একই অবস্থার কথা জানান, দুবাই প্রবাসী ঈদগাঁওর মুহাম্মদ ইউনূস খান। ভিসাধারী অনেক বাঙালি এখানে আগে সরকারের কিছু কাজের এজেন্ট হিসেবে কাজ করতো। বিগত বছর থেকে দুবাইয়ের স্থানীয়রা এসব কাজ ভাগিয়ে নেয়ায় হাজার হাজার বাঙালির আয় কমেছে।

চলতি বছরের শুরু থেকে মালয়েশিয়াসহ অন্য যেসব দেশে ভিসাহীন অভিবাসী রয়েছে তারা ধরপাকড় ও কর্মহীনতায় ভুগছে। ফলে তারা পরিবারকে আগের মতো আর্থিক সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

কক্সবাজার জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রমিয়ন কান্তি দাশ বলেন, ২০০৪ সালের আগে কক্সবাজার থেকে কত মানুষ কাজ নিয়ে বিদেশে গেছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কারণ, ২০০৪ সাল থেকেই বিদেশ যাওয়া মানুষের ডাটাবেজ কম্পিউটারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সেই হিসেবে বিগত ১৩ বছরে (২০০৪-২০১৭) মোট ৮৪ হাজার ৪০ জন পুরুষ ও ৩ হাজার ৮০ জন নারী চাকরি ভিসায় বিদেশে গেছেন। সৌদি আরব, কুয়েত, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে এসব কর্মীরা উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দেশে থাকা স্বজনদের কাছে পাঠাচ্ছেন। পরিবার স্বচ্ছল হওয়ার পাশাপাশি তাদের আয় নানাভাবে অবদান রাখছে জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে।

এরা ছাড়াও ওমরাহ কিংবা অন্যভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধ প্রবাসী হিসেবে প্রবাস খাটছেন কক্সবাজারের প্রায় লাখো মানুষ, এমনটি মনে করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান। তার মতে, সবাই কম-বেশি টাকা দেশে পাঠান। কিন্তু চলতি বছর সেই ধারাবাহিকতায় একটু ছেদ পড়েছে বলে খবর এসেছে।

ঈদগাঁও গরুবাজারের খাসকালেকশন সদস্য মো. আরমানের মতে, ঈদগাঁও, পোকখালী, চৌফলদন্ডী, পিএমখালী, রামুর বিভিন্ন ইউনিয়নের সিংহভাগই প্রবাসী। প্রবাসী পরিবারগুলো প্রায় পরিচিত। পূর্বের কোরবানিতে এসব পরিবার ছোট বা মাঝারি সাইজের গরু একক কোরবানির জন্য কিনেছে। কিন্তু এ বছর জেলার ৫৭টি বাজারেই পর্যাপ্ত পবাদিপশু থাকলেও গত বছরের চেয়ে এবার কোরবানি পশুর দামে রেকর্ড ভেঙেছে। আগে যে টাকায় একটি ছোট বা মাঝারি গরু কেনা যেত এ বছর সে টাকায় একটি পশুর সাতভাগে দু বা তিনভাগই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অংশীদারি কোরবানির সংখ্যা বাড়ছে আর পশু বিক্রির হার কমছে। বাড়তি দাম ও প্রবাসে আয় কমায় এ পরিস্থিতি হচ্ছে বলে ধারণা তারও।

জেলার উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ অন্যান্য এলাকাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানান সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা।

কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র মতে, এবার কক্সবাজারের ৮ উপজেলায় প্রায় ৮৪ হাজার কোরবানি পশুর চাহিদা রয়েছে। সেই লক্ষ্য মাথায় রেখেই কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৭টি, রামুতে ৬টি, চকরিয়ায় ১১টি, পেকুয়ায় ৪টি, উখিয়ায় ৬টি টেকনাফে ৭টি, মহেশখালীতে ৯টি ও কুতুবদিয়ায় ৭টি পশুর হাটে বিক্রেতারা পর্যাপ্ত গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ মজুদ করেছে। কোরবানি করতে ইচ্ছুক ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা একক বা অংশীদারি ভিত্তিতে ইতোমধ্যে প্রায় পশু সংগ্রহ করেছে। বাকি যা রয়েছে তা আজ (মঙ্গলবার) কিনে নিবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এমএএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :