ছেউড়িয়ায় সুরের মূর্ছনায় জমেছে বাউল মেলা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০২:০২ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৮

বাউলকুলের শিরোমনি ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাউল ও ভক্ত-শিষ্য অনুরাগীসহ জনতার ঢল নেমেছে। কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার লালন আখড়াচত্বর উৎসবমুখর ও মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বাউল-বাউলানি, দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ বিপুল সংখ্যক জনতার পদভারে লালন আখড়ায় এখন নেই তিলধারণের ঠাঁই।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি মাহবুব-উল আলম হানিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, অ্যাডভোকেট অনুপ কুমার নন্দী, লালন একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাইজাল আলী খান, অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মাসুম, সাংবাদিক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব।

জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. শাহিনুর রহমান। স্বাগত বক্তা ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তরফদার সোহেল রহমান।

বক্তারা বলেন, লালনের আধ্যাত্মিকতা ও দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে গবেষণা হচ্ছে। ফকির লালন ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তিনি জাতি ও ধর্মে কোনো ভেদাভেদ না করে মানবকল্যাণের জন্য মানবতাবাদী গান গেয়ে গেছেন। এছাড়া তার মানবতাবাদী গানের মধ্যদিয়ে দ্বন্দ্ব ও সকল হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে মানুষে মানুষে ভালোবাসার কথা বলে গেছেন। তিনি তার জীবদ্দশায় সবসময় সত্যের অনুসন্ধান করে গেছেন।

লালনের জীবনী ও দর্শন নিয়ে আলোচনা শেষে রাতে শুরু হয় লালনগীতির জমকালো সঙ্গীতানুষ্ঠান। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ দেখা দিও ওহে রাসুল ছেড়ে যেও না/ সেই কালাচাঁদ নদে এসেছে/ পারে লয়ে যাও আমারে/ খাঁচার ভিতর অচিন পাখি/ জাত গেল জাত গেল/ মিলন হবে কত দিনে/ কে বানাইল এমন রঙমহল খানা- ইত্যাদি গানে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা দারুন মুগ্ধ হন।

মরা কালী নদীর পাড়ে লালন একাডেমির মূলমঞ্চে গানের অনুষ্ঠান ছাড়াও মাজারের চারিদিকে একতারার টুং-টাং শব্দ ও নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বাউলশিল্পীরা খণ্ড খণ্ড গানের আসর বসিয়েছেন। এসব গানের আসর দর্শকদের যেন ভিন্নরকম বৈচিত্র্য এনে দেয়। গানের অনুষ্ঠান ছাড়াও লালন একাডেমি চত্বরের গ্রামীণ মেলায় ছিল উপচেপড়া ভিড়।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কুমারীডাঙ্গা গ্রামের বাউল ফকির আব্দুর রহমান বলেন, প্রতিবছরই সাধক লালনের মৃত্যুবার্ষিকী ও দোল পূর্ণিমার তিথিতে আয়োজিত স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানে এসে সাঁইজির দর্শন ও তার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করি। প্রাণের টানেই লালন মাজারে ছুটে আসি।

ফরিদপুর থেকে আগত বাউল ফকির আব্দুল করিম জানান, সাধুসঙ্গ, অধিবাস, বাল্যসেবা ও পুণ্যসেবা গ্রহণের জন্য তিনি প্রতিবছর লালন মাজারে আসেন। মরমী সাধক ফকির লালন গানের মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষে মানুষে যে ভালোবাসার কথা বলে গেছেন তার সেই পথ অনুসরণ করতেই এ মিলনমেলায় তিনি ছুটে এসেছেন।

ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার বাউল ফকির আব্দুল বাতেন জানান, সাঁইজির মাজার দর্শন, প্রার্থনাসহ মনের প্রশান্তি লাভের লালন আখড়ায় এসেছেন তিনি। সাঁইজির মাজারে প্রার্থনা ও ভক্তির মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ করা যায় বলে এ বাউল ফকির জানান।

উল্লেখ্য, ফকির লালন ছিলেন ভাবজগতের গানের রাজা ও বাউলের শিরোমনি। তার গান মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে দারুণভাবে। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ফকির লালন মৃত্যুবরণ করেন। বাউল ও শীষ্য-ভক্তরা লালন আখড়াকে তাদের তীর্থক্ষেত্র বলে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন।

আল-মামুন সাগর/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :