নওগাঁয় কমছে চাতাল শ্রমিক
উত্তরাঞ্চলের শষ্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত নওগাঁ। জেলায় ব্যাপক ধান উৎপাদন হওয়ায় এক সময় চালকলও গড়ে উঠেছিল অনেক। আর এসব চালকলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন প্রচুর শ্রমিক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন কমছে চালকলের সংখ্যা। শ্রমিকরাও বেছে নিচ্ছেন ভিন্ন পেশা।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয় ও চালকল মালিকদের কাছ থেকে জানা গেছে, এ জেলায় প্রতি বছর প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। জেলায় ১ হাজার ২৮০টি চালকল রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি অটোরাইস মিল এবং বাকিগুলো হাসকিং মিল।
চালকলগুলোতে নারী শ্রমিকদের সংখ্যাই বেশি। নারী শ্রমিকদের মজুরি কম হওয়ায় চালকল মালিকদের আগ্রহও থাকে বেশি। এসব শ্রমিকদের মাসিক নির্দিষ্ট কোনো বেতন থাকে না। কাজের উপর মজুরি।
৮-১০ বছর আগে প্রতি চাতালে ২০০ মণ ধান শুকানো ও ভাঙার পর প্রতি কেজিতে ১ টাকা এবং খুদ (ভাঙা চাল) ৬০ কেজি করে দেয়া হতো। এতে শ্রমিকরা যে টাকা পেতেন তা দিয়ে দিব্যি সংসারের খরচ চালাতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে ওই পরিমাণ ধান শুকানো ও ভাঙার পর ৫০০ টাকা ও ৫০ কেজি চাল দেয়া হয়। তারপরও জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ায় আগের মতো আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অন্য কাজের প্রতি ঝুঁকছেন শ্রমিকরা।
এছাড়া চাতালে ঈদ-উল-ফিতরে নারী শ্রমিকদের দেয়া হয় একটি শাড়ি ও ব্লাউজ পিস। দুই ঈদে ছুটি দেয়া হয় ১৬ দিন। বছর শেষে ১ হাজার ৫শ টাকা করে হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। সেটাও শর্তসাপেক্ষে। যদি কেউ পুনরায় চাতালে কাজ করতে চান কেবল তাহলেই তাকে এ টাকা দেয়া হয়।

এদিকে চালকলে নারী শ্রমিকরা অধিকাংশ স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা। তাই নিরুপায় হয়ে চালকলে তারা কাজ করে থাকেন। তবে আলো-বাতাসহীন ছোট খুপড়ি ঘরে গরমে কষ্ট করে থাকেন এসব শ্রমিকরা। ফলে অধিকাংশ শ্রমিকরা অসুস্থতায় ভোগেন। খাবারও স্বাস্থ্যসম্মত না।
গত ২০ বছর থেকে চাতালে কাজ করছেন সদর উপজেলার মশরপুর গ্রামের ইয়াসিন আলী (৫০)। তিনি বলেন, আগে দেড় হাজার টাকা মাসিক বেতনে চাতালে কাজ করতাম। কোনো সমস্যা হতো না। আর এখন ৬ হাজার টাকা মাসে বেতন পাই। তারপরও হচ্ছে না। বাজারের জিনিসপত্রের দাম এতটাই বেশি যে আমাদের সাধ্যের বাইরে।
তিনি বলেন, আগে বহু মানুষ চাতালে কাজ করত। কিন্তু এখন অনেক কমে গেছে। অন্য পেশায় চলে গেছে এবং আরো যাচ্ছে।
নওগাঁ জেলা ধান্য বয়লার ও অটোশার্টার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, জেলায় চালকলে শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৮৬৬ জন। এরমধ্যে নারী ২৭ হাজার ২২০ এবং পুরুষ ১৮ হাজার ৬৪৬ জন। শ্রমিকদের মজুরি কম। কিন্তু কাজ বেশি। ফলে তাদের স্বল্প টাকায় পোশায় না। এছাড়া অনেক চালকল এখন বন্ধের পথে। প্রয়োজনের তুলনায় মজুরি কম হওয়ায় শ্রমিকরাও এখন ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছে।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, জেলার প্রায় সাড়ে ৯শ চালকলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চাল উৎপাদন বন্ধ থাকায় ব্যাংক থেকে নেয়া প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা ঋণের বোঝা চেপেছে ব্যবসায়ীদের কাঁধে।
তিনি বলেন, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান চালের মজুত থাকার পরও বাইরে থেকে চাল আমদানির কারণে দেশের চালকলগুলো এখন লোকসান গুনছে। সেইসঙ্গে কৃষকরাও ধানের নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আব্বাস আলী/এফএ/এমএস