আমার হাত অনেক লম্বা

মীর আব্দুল আলীম
মীর আব্দুল আলীম মীর আব্দুল আলীম , সাংবাদিক রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশিত: ০৫:০৭ পিএম, ০৩ নভেম্বর ২০১৮

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা পুলিশের ওসি মনিরুজ্জামান মনিরের বিরুদ্ধে মাসে অর্ধকোটি টাকা ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার ঘুষ-বাণিজ্য থেকে রেহাই পাচ্ছেন না কেউ।

মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়, গ্রেফতার বাণিজ্য, নাশকতার মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের ভয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও খুনের ঘটনায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে এ ঘুষ-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা কোনো প্রতিবাদ করলে ওসি বলেন, অভিযোগ করে লাভ নাই, কেউ কিছুই করতে পারবে না, ওপর মহলে আমার লোক আছে, যত পারেন অভিযোগ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছয় মাস আগে রূপগঞ্জ থানায় যোগ দেন ওসি মনিরুজ্জামান। এরপর শুরু করেন গ্রেফতার বাণিজ্য। গ্রেফতার বাণিজ্য চালিয়ে বর্তমানে একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন তিনি। ভিকটিমের পরিবার, খুনি চক্র এমনকি সাক্ষীরাও তার কাছ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। টার্গেট পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নানাভাবে হয়রানি করেন ওসি। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন, প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে চার্জশিট, ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেফতারের মতো বিষয় বাদ দিয়ে কেবল খুনের মামলা খুঁজে খুঁজে তদবির করেন তিনি। পাশাপাশি জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ, নারী নির্যাতন, হয়রানি, দলীয় কোন্দল এবং ছোট ঘটনাকে বড় করে টাকা আয়ের পথ বেছে নেন।

সেইসঙ্গে দলীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষকলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ, শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীদের আসামি করে মামলার রেকর্ড গড়েছেন ওসি মনিরুজ্জামান।

ভুক্তভোগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ওসি মনিরুজ্জামান রূপগঞ্জ থানার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে গ্রেফতার বাণিজ্য করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছেন। থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনো নেতাকে ঘুষ ছাড়া ছাড়েন না তিনি। রীতিমতো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতনের মিশনে নেমেছেন।

ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, বিভিন্ন সময় দলীয় বিরোধের তুচ্ছ ঘটনায় দেড় সহস্রাধিক নেতাকর্মী মামলার আসামি হয়েছেন। পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপগঞ্জ থানা পুলিশের দুই এসআই জানান, ওসির টেবিলের গ্লাসের নিচে রূপগঞ্জ উপজেলার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি তালিকা রয়েছে। কার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কয়টা মামলা হয়েছে সেখানে উল্লেখ আছে। নতু কোনো ঘটনা ঘটলে বা কেউ কোনো মামলা দিতে এলে গ্লাসের নিচে রাখা তালিকা দেখে পছন্দ মতো কয়েকজনের নাম সংযুক্ত করে দেন ওসি। সেই সঙ্গে নামে-বেনামে মামলা দিয়ে ঘুষ বাণিজ্য চালান।

রূপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূইয়া বলেন, ওসি মনিরুজ্জামান বিএনপির মামলায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের আসামি করেছেন। ছোট বিষয়কে বড় করে চালাচ্ছেন ঘুষ বাণিজ্য। কেউ রেহাই পাচ্ছেন না তার কাছ থেকে। বিশেষ উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হয়রানি করছেন।

থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলেন, ডিউটি বণ্টনের সময় রাতে টার্গেট দিয়ে দেয়া হয় অফিসারদের। অফিসারদের বলে দেয়া হয় লোকজন ধরার পর উৎকোচ নিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। ফলে দায়িত্বে থাকা অফিসাররা টার্গেট পূরণে বাণিজ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সম্প্রতি মৈকুলী এলাকার এক ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এমন ঘটনা অনেক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমার এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হলে মামলা হওয়া স্বাভাবিক। তবে ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি সঠিক নয়।

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে কিছু লিখলে আমার কিছু যায় আসে না। আমার হাত অনেক লম্বা। ওপরে আমার ‘হ্যাডমওয়ালা’ লোক আছে। আমি যখন যেখানে চাই সেখানেই বদলি হই। না চাইলে কেউ আমাকে বদলি করতে পারবে না। আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হলে যেকোনো সাজা মাথা পেতে নেব। আমি আমার মতো চলি। কে কি বলল তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।

মীর আব্দুল আলীম/এএম/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।