১৫ বিয়ে করা নুরুর জন্য সাবিনার জীবন ওলট-পালট

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ০৪:৪১ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

তিন সন্তানের জননী সাবিনা আক্তার (৩৪)। স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিন মাস আগে তালাক দিয়েছেন। এরপরও তালাকপ্রাপ্ত স্বামীর নির্যাতন আর ভয়ভীতি থেকে মুক্তি মেলেনি সাবিনার।

তালাকপ্রাপ্ত স্বামী ট্রাকচালক নুরু (৫৫) বাড়িতে গিয়ে প্রতিদিন সাবিনাকে মারপিট করেন এবং হত্যার হুমকি দেন। নির্যাতনের হাত থেকে সাবিনাকে বাঁচাতে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে তাদেরও হত্যার হুমকি দেন নুরু। ফলে তিন মাস ধরে তিন কন্যা সন্তান নিয়ে গৃহবন্দি রয়েছেন সাবিনা।

ঘটনাটি পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের কহুরুহাট এলাকার। এসব ঘটনায় মামলা করেন সাবিনা। ওই মামলায় নুরুকে জেলহাজতে পাঠিয়েছিল পুলিশ। পরে জামিনে বেরিয়ে সাবিনার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন নুরু। এ অবস্থায় সাবিনা আক্তার নিজের নিরাপত্তা চেয়েছেন পুলিশের কাছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

নির্যাতিত সাবিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৯ বছর আগে কহুরুহাট এলাকার দরিদ্র সলেমান আলীর মেয়ে সাবিনা আক্তারকে বিয়ে করেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বল্লারচর এলাকার দুধু মিয়ার ছেলে নুরুল ইসলাম নুরু। পেশায় তিনি ট্রাকচালক। বিয়ের পর সাবিনাকে ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও পাবনাসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে রাখেন। বিয়ের পর থেকে বিভিন্নভাবে সাবিনার ওপর নির্যাতন শুরু করেন মাদকাসক্ত স্বামী নুরু।

চার বছরের মাথায় তাদের প্রথম কন্যা সন্তান হয়। এরপর মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নির্যাতন সহ্য করে সংসার করতে থাকেন সাবিনা। এর মধ্যে পেশাগত কারণে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের সুযোগে একের পর এক বিয়ে করেন নুরু।

Panchagarh-Woman

সাবিনার দাবি, আমাকে বিয়ে করার পর বিভিন্ন এলাকায় আরও ১৫টি বিয়ে করেছে নুরু। এসবের মধ্যেও একটি ছেলের আশায় আরও দুই মেয়ে সন্তান জন্ম দেই। বড় মেয়ে নুরী ইসলাম সাথী এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। মেজো মেয়ে নুরিয়া ইসলাম বিথি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে নুসরাত জাহান ইতির বয়স দুই বছর। তিন মেয়ে নিয়ে বাবার বাড়ি বসবাস শুরু করি। সেখানে ১২ শত জমি কিনে বাড়ি করি। এর মধ্যে বাড়ির জমি বিক্রির জন্য আমাকে চাপ দেয় নুরু। মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে জমি বিক্রি করতে না চাইলে আমাকে মারধর শুরু করে। ওরে বিয়ে করে আমার জীবন ওলট-পালট হয়ে গেছে।

সাবিনা বলেন, গভীর রাতে বাড়িতে মাদকাসক্ত বন্ধুদের নিয়ে মদ ও জুয়ার আসর বসায় সে। নির্যাতন থেকে বাঁচতে তিন মাস আগে নুরুকে তালাক দেই। তালাক দেয়ার পরও বাড়িটি নিজের দাবি করে আমাকে হুমকি দেয়। গভীর রাতে ছুরি, রামদা, অ্যাসিড ও পেট্রল নিয়ে আমাকে মারতে আসে। আমি ও আমার সন্তানদের মারধর করে, বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রতিবাদ করলে গভীর রাতে প্রতিবেশীদের হত্যার হুমকি দিয়ে এলাকায় মাইকিং করে। তালাকের পরও তার নির্যাতনের কথা পুলিশকে জানালে আবারও মামলার পরামর্শ দেয় পুলিশ।

সাবিনা আক্তার বলেন, বিয়ের পর থেকেই নুরু আমার ওপর নির্যাতন শুরু করে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তালাক দিয়েছি। তালাকের পরও নির্যাতন করেই যাচ্ছে। আমাকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করেছে। কোনোমতে বেঁচে আছি। আমি কোথাও বিচার পাচ্ছি না। তিন মাস ধরে বন্দি। রাস্তায় ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নুরু। মেয়েদের স্কুলের বইও পুড়িয়ে দিয়েছে। তিন মেয়ে নিয়ে বন্দিজীবন কাটাচ্ছি। পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছি। কোনো লাভ হয়নি।

Panchagarh-Woman

সাবিনার মা রাবেয়া খাতুন বলেন, অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নুরুকে তালাক দিয়েছে সাবিনা। কিন্তু তারপরও অত্যাচার থেমে নেই। প্রতি রাতে বাড়িতে হামলা করে, আমরা ঘুমাতে পারি না। আমরা নুরুর অত্যাচার থেকে মুক্তি চাই।

জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম ওরফে নুরু ড্রাইভার বলেন, ১৯ বছর সংসার করার পর কার বুদ্ধিতে সাবিনা আমাকে তালাক দিলো বুঝতে পারছি না। অন্য কারও প্ররোচনায় আমাকে তালাক দেয়। আমি তার গায়ে হাত তুলিনি। আমার টাকায় বাড়িটি করা হয়েছিল। তালাক দেয়ার পরও সে আমার বাড়িতে কিভাবে থাকে। বাড়িতে গেলে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। আমাকে ফাঁসানোর জন্য মামলা করেছে। সালিসের মাধ্যমে পাশের ছয় শতক জমিতে মাটি ভরাট করছি, সেখানে বাড়ি করব। আমি একাধিক বিয়ে করিনি। এসব মিথ্যা।

চাকলাহাট ইউপির চেয়ারম্যান ফরহাদ হোসেন বলেন, স্ত্রীকে নির্যাতনের জন্য আমি গ্রাম পুলিশ দিয়ে নুরুকে ধরে এনেছিলাম। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেই। মামলাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আসে। গভীর রাতে এলাকায় এসে অত্যাচার করে নুরু। বিষয়টি সালিসযোগ্য নয়, তাই সাবিনাকে পুলিশ এবং আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদর্শন কুমার রায় বলেন, এ বিষয়ে ওই নারী একটি মামলা করেছিলেন। মামলার প্রেক্ষিতে আমরা নুরুকে গ্রেফতার করে হাজতে পাঠাই। বর্তমান সে জামিনে। জামিনে বেরিয়ে আবারও নির্যাতন করছে- এমন অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। শুনেছি বাড়ির জমি নিয়ে তালাকপ্রাপ্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে জমি ভাগাভাগির মাধ্যমে সালিসের কথাও শুনেছি। এরপরও নুরু ড্রাইভারের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।

সফিকুল আলম/এএম/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :