নিঃশব্দের শিকারি লক্ষ্মীপেঁচা

রিপন দে
রিপন দে রিপন দে মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ১১:৪৭ এএম, ২১ জানুয়ারি ২০১৯
ছবি : আদনান আজাদ আসিফ

সূর্য ডোবার পর যেমন দেখা মেলে তেমনি সূর্য ওঠার আগেই এরা আড়ালে চলে যায়। সম্পূর্ণ নিশাচর এই প্রাণীটির নাম লক্ষ্মীপেঁচা। আকারে প্রায় ৩৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্ব হয়। দেহের উপরের রং হালকা সোনালি এবং নিচের অংশ ধুসর সাদা। এদের মুখমণ্ডল খুবই আকর্ষণীয় এবং গঠনের দিক থেকে দেখতে প্রায় হৃদয়াকৃতির।

পরিত্যাক্ত বাসা, বাড়ির কার্নিশ ও গাছের কোটরে থাকতে পছন্দ করে এরা। সাধারণত লক্ষ্মীপেঁচাকে জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়। শিকারের জন্য এদের রয়েছে ধারাল এবং লম্বা নখ। শিকারের মাধ্যমে তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

লক্ষ্মীপেঁচার মূল খাবার ইদুর। তবে এর পাশাপাশি কাঠ বিড়ালির বাচ্চা, সাপ, টিকটিকি ও পাখির বাচ্চা খেতে পছন্দ করে। এরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ শিকারি। এদের পালকে এক বিশেষ ধরনের আঁশ থাকে যা সব ধরনের শব্দ তরঙ্গকে ভেঙে ফেলতে পারে। এরা এতটাই নিঃশব্দে ওড়ে যে বাতাসে উড়তে উড়তেই কয়েকশ গজ দূর থেকে ইদুরের পায়ের শব্দ নির্ভুলভাবে শুনতে পায়।

pecha

লক্ষ্মীপেঁচার ইংরেজি নাম Barn Owl, বৈজ্ঞানিক নাম Tyto alba। বাংলাদেশে এদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন না হলেও আগের থেকে এদের এখন কম দেখা যায়। এরা নিশাচর প্রাণী। আঁধার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের দেখা যায় এবং ডাক শোনা যায়। এরা মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। এর অন্যতম কারণ, তাদের প্রিয় খাবার ইদুরের অবস্থান মানুষের বসতির আশপাশেই।

যেহেতু মানুষের পাশেই এদের বসবাস তাই অনেক সময় মানুষ এদের বাসা ভেঙে দেয়। এতে এদের বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়।

লক্ষ্মীপেঁচা নিয়ে ধর্মীয় মিথও প্রচলিত আছে। সনাতন ধর্মের মতে দেবী লক্ষ্মীর বাহন লক্ষ্মীপেঁচা। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে তাই লক্ষ্মীপেঁচা খুবই সম্মানের। তবে বাস্তবতার নিরিখে এরা পরিবেশের জন্য খুব উপকারী। এরা ইদুর শিকার করে আমাদের ফসল রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

pecha

ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার আদনান আজাদ আসিফ জানান, এরা খুবই দ্রুত এবং নিঃশব্দে শিকার ধরতে পারে। তবে এদের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয় ব্যাপকভাবে। লোকালয়ের আশপাশে ১০০টি লক্ষ্মীপেঁচার বাচ্চার মধ্যে একটি বাচ্চা প্রাপ্ত বয়স্ক হতে পারে। কারণ মানুষ এদের ভয়ঙ্কর প্রাণী ভেবে মেরে ফেলে।

তিনি জানান, এদের প্রিয় খাবার ইদুর এবং মানুষের আশপাশে এরা বসবাস করে। এরা বাচ্চার খাবারের জন্য বাসায় প্রচুর ইদুর সংগ্রহ করে আনে। কিন্তু বাচ্চারা অনেক সময় পুরো ইদুর খেতে পারে না। ইদুরের অবশিষ্ট অংশ পচে আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়ায় যা মানুষের কাছে অসহ্য। আর মানুষ তা পরিষ্কার করতে গিয়ে এদের বাসার সন্ধান পায়। ভয় পেয়ে বাচ্চাগুলোকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। মানুষ সচেতন হলে এদের রক্ষা করা সম্ভব।

বণ্যপ্রাণী সংরক্ষক ও গবেষক তানিয়া খান জানান, প্রতিটি প্রাণী মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়। ইঁদুর প্রতি বছর প্রচুর ফসল নষ্ট করে। লক্ষ্মীপেঁচা ইদুর খেয়ে ফসল যেমন রক্ষা করে তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই মানুষের এদের ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

এফএ/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :