ঝিনাইদহের ক্লিনিকগুলো যেন মরণ ফাঁদ


প্রকাশিত: ০৭:০৬ এএম, ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৫

ঝিনাইদহের হাটে বাজারে গড়ে উঠা ক্লিনিকগুলো যেন মরণ ফাঁদ। সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরিবর্তে রোগীরা বাড়ি ফিরছেন লাশ হয়ে। ফলে শহর ও হাটে বাজারে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ক্লিনিকগুলো কসাই খানায় পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, কয়েক দিনের ব্যবধানে জেলার মহেশপুর উপজেলার ভৈরব বাজারের জননী ক্লিনিক ও শৈলকুপার আয়েশা ক্লিনিকে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও এই দুটি ক্লিনিকে ১০/১২ জন মারা গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কয়েক দিনের ব্যবধানে মহেশপুর উপজেলার ভৈরব বাজারে অবস্থিত জননী ক্লিনিক ও নার্সিং হোমে ৯ জন প্রসূতিকে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে অস্ত্রোপচারের পর মারা যায় মহেশপুরের জাগুসা গ্রামের আক্তার আলীর স্ত্রী রুপা খাতুন (২০), অনন্তপুর গ্রামের আবদুস সামাদের স্ত্রী আরিফা খাতুন (১৮), কৃষ্ণচন্দ্রপুর গ্রামের নাজমুল ইসলামের স্ত্রী বিথি খাতুন (২০) ও জীবননগর উপজেলার বারান্দী গ্রামের ইউনুছ আলীর স্ত্রী সালেহা বেগম (২৬)।

এছাড়া মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন আরো পাঁচজন। এরা হলেন, মহেশপুর উপজেলার গাড়াপোতা গ্রামের আলী কদর মোল্ল­ার মেয়ে উম্মে সালমা, মাইলবাড়িয়া গ্রামের জহুরুল ইসলামের স্ত্রী পারভিনা খাতুন (২৫), বাগানমাঠ গ্রামের আবদুল আজিজের মেয়ে জেসমিন আক্তার (২৩), হুদাপাড়া গ্রামের আনিসুর রহমানের স্ত্রী নার্গিস খাতুন (২১) ও কাজিরবেড় ইউনিয়নের কোলা গ্রামের আবদুল আজিজের স্ত্রী পারুল খাতুন (২২)। এদিকে শৈলকুপা উপজেলার আয়েশা ক্লিনিকে হিটলার (১৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

দুই উপজেলায় কয়েক দিনের ব্যবধানে পাঁচ রোগীর মৃত্যুর বিষয়ে ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. আবদুস সালাম জাগো নিউজকে জানান, খবর পেয়ে তিনি ক্লিনিক পরিদর্শন করেছেন। ক্লিনিক দুটিতে অজ্ঞান করার (অ্যানেসথেসিয়া) কোনো যন্ত্রপাতি তার চোখে পড়েনি। অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার অটোক্লেভ মেশিনও নেই। অস্ত্রোপচার কক্ষে আবর্জনাময় জিনিস স্তুপ করে রাখা হয়েছে। তিনি ধারণা করছেন, সংক্রমণ থেকে প্রসূতিদের মৃত্যু হয়েছে।

সিভিল সার্জন আরো জানান, শহর ব্যতীত বাইরের ক্লিনিকগুলোতে অস্ত্রোপচার করার কোনো পরিবেশ নেই। ক্লিনিকে সর্বক্ষণ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স নেই। তারপরও এই ক্লিনিকগুলো চলছে বলে তিনি জানান। তবে মহেশপুরের ভৈরব বাজারের কসাইখানাখ্যাত জননী ও শৈলকুপার আয়েশা ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে সিভিল সার্জন জানান।

ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় ১১৪টি ক্লিনিক রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে বৈধ অবৈধভাবে গজিয়ে ওঠা প্যাথজলিক্যাল ক্লিনিক। অনেকে গায়ের জোরে ক্লিনিক ও প্যাথলজি চালাচ্ছেন। মহেশপুর এলাকায় ৩০টি ক্লিনিক রয়েছে। এসকল ক্লিনিকে দেদারছে অস্ত্রোপচার করেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মকর্তা গোলাম রহমান, ৩৩তম বিসিএস এ নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসক মো. আসাদুজ্জামান ও ডা. নিপু।

সদর উপজেলার হলিধানী,বৈডাঙ্গা বাজার, সাধুহাটী মোড়, ডাকবাংলা বাজার, দশমাইল, বাজারগোপালপুর, নারায়ণপুর ত্রিমোহনী, বিষয়খালী বাজার ও হাটগোপালপুরে এ ধরনের ক্লিনিকের অস্তিত্ব রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে বৈডাঙ্গা বাজার, সাধুহাটী মোড়, ডাকবাংলা বাজার, দশমাইল ও বাজার গোপালপুর এলাকায় মুন্সি মো. শাহিন রেজা সাঈদের নিউ ইসলামী প্রাইভেট হাসপাতাল নামে একাধিক ক্লিনিক রয়েছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জেলার ক্লিনিকগুলোতে রোগী মারা গেলেও চিকিৎসক বা ক্লিনিক মালিকের দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি হয়নি। ডাক্তাররা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দ্রুত টাকা লেদদেন করে রফা করেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে কালীগঞ্জের ইবনে সিনা, সুমন, হরিণাকুন্ডুর ভাই ভাই ও ফারজানা ক্লিনিকসহ ৭টি ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। এ সকল ক্লিনিকে কোনো স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নেই।

এ বিষয়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক গোলাম রহমান জাগো নিউজকে জানান, অপারেশনের যন্ত্রপাতি ঠিকমতো দূষণমুক্ত না করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। এই কারণেই রোগীদের মেনিনজাইটিস দেখা দিচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

মহেশপুরের জাগুসা গ্রামের আবু বক্কর জাগো নিউজকে জানান, দেড় লাখ টাকা খরচ করেও তার মেয়ে রুপাকে বাঁচাতে পারিনি। আমি গরিব মানুষ। এখন রুপার শিশুটির কী হবে ভেবে পাচ্ছি না।

রুপার চাচা মসিয়ার রহমান  জাগো নিউজকে জানান, ক্লিনিক মালিক খোকন তাদের ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি বলেন, টাকা নয়, আমরা এর সঠিক বিচার চাই।

এসএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।