হলুদের ডালা নববধূর শাড়ি রেখে চলে গেল মেঘা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ০৬:৩১ পিএম, ২৫ এপ্রিল ২০১৯

৩ বছর ধরে ইডেন কলেজের ছাত্রী ঝালকাঠির সায়মা কালাম মেঘার সঙ্গে বরিশাল হাতেম আলী কলেজের ছাত্র ঝালকাঠির মাহিবি হাসানের প্রেমের সম্পর্ক। প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে তারা পারিবারিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেও বাধা হয়ে দাঁড়ান মাহিবির মা সেলিনা বেগম। তিনি কোনোমতেই মাহিবি-মেঘার সম্পর্ক মেনে নেননি। মায়ের বাধায় প্রেমিকা মেঘাকে বিয়ে করতে টালবাহানা শুরু করেন মাহিবি।

একাধিকবার বিয়ের দিন নির্ধারণ আবার পরিবর্তন করে নতুন কৌশল অবলম্বন করেন মাহিবি ও তার পরিবার। বিষয়টি নিয়ে প্রেমিক মাহিবির সঙ্গে একাধিকবার বাগবিতণ্ডা হয় প্রেমিকা মেঘার। রোববারও (২১ এপ্রিল) বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে প্রেমিককে ভিডিও কলে রেখে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন প্রেমিকা মেঘা।

নিজের ওড়না সিলিং ফ্যানের সঙ্গে পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে প্রেমের সম্পর্কের ইতি টেনে না ফেরার দেশে চলে যান মেঘা। ভিডিওতে প্রেমিকার করুণ মৃত্যু দেখেও মন গলেনি প্রেমিক মাহিবির। প্রেমিকার মৃত্যুর পর সহপাঠী আফরিন জাহান ও মেঘার মা রুবিনা আজাদকে ফোন দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি জানান মাহিবি।

jalokati-Megha

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঝালকাঠি শহরের পূর্ব চাঁদকাঠির বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে নির্মম এ আত্মহত্যার বর্ণনা দেন মেঘার বাবা-মা। এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তার চাচা আবুল বাশার। সংবাদ সম্মেলনে মেঘার মা রুবিনা আজাদ, বাবা আবুল কালাম ও চাচাতো ভাই মাইনুল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকার ৭৪/১ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের চারতলা বাড়ির চারতলার একটি কক্ষ থেকে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ইডেন কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সায়মা কালাম মেঘার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মেঘার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে ঝালকাঠি শহরের মুসলিম পৌর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

jalokati-Megha

এ ঘটনায় রোববার রাতেই কলাবাগান থানায় মামলা করেন মেঘার চাচা আবুল বাশার। মামলায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ঝালকাঠি শহরের পূর্ব চাঁদকাঠি এলাকার মাহিবি হাসানের (২৫) প্ররোচনায় গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে মেঘা।

আত্মহত্যার কারণ হিসেবে মেঘার বাবা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজে পড়ার সময় শহরের পূর্ব চাঁদকাঠি এলাকার মৃত নফিসুর রহমানের ছেলে বরিশাল হাতেম আলী কলেজের ছাত্র মাহিবি হাসানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে মেঘার। ২০১৭ সালে মেঘা ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হয়। কাঁঠালবাগান এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতো মেঘা।

তিনি বলেন, ঢাকায় গিয়ে মাহিবি প্রায়ই মেঘার সঙ্গে দেখা করতো। মাস ছয়েক আগে মেঘা এবং মাহিবি বিয়ের ব্যাপারে একমত হয়। কিন্তু এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান মাহিবির মা ঝালকাঠির কীর্ত্তিপাশা হাসপাতালের নার্স সেলিনা বেগম। শবে বরাতের দুদিন আগে কাউকে না জানিয়ে ঢাকায় তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এজন্য মেঘা কিছু কেনাকাটাও করেছিল। কিন্তু মাহিবি ওইদিন কথা দিয়ে বিয়ের জন্য আসেনি। এ নিয়ে মোবাইলে তাদের ঝগড়া হয়।

আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, রোববার বিকেলে মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও মেঘা এবং মাহিবির ইমোতে কথা হয়। ভিডিও কলে কথা বলার সময়ই মেঘা তার প্রেমিক মাহিবিকে বলেছে, যদি বিয়ে না করো তাহলে এখনই আমি আত্মহত্যা করব। পরে মাহিবিকে ভিডিও কলে রেখে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ে মেঘা। মর্মান্তিক এ দৃশ্য দেখেও পাষণ্ড মাহিবি মেঘাকে বিয়ে করার আশ্বাস দেয়নি। মৃত্যুর পর মাহিবি মেঘার মা রুবিনা আজাদকে মোবাইলে মেঘার মৃত্যুর সংবাদ দেয়। মেঘার মা বিষয়টি ঢাকায় মেঘার বান্ধবী আফরিন জাহানকে জানালে কাঁঠালবাগানের বাসায় যায়। তারা বাসায় গিয়ে বাড়ির মালিকের সহায়তায় দরজা ভেঙে ঝুলন্ত অবস্থায় মেঘাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মেঘাকে মৃত ঘোষণা করেন।

jalokati-Megha

খবর পেয়ে মেঘার চাচা আবুল বাশার কলাবাগান থানায় মামলা করেন। মামলার পর কলাবাগান থানা পুলিশের এসআই মো. সেলিম রেজা মেঘার মরদেহের ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করেন।

এসআই সেলিম রেজা বলেন, মেঘার চাচা যে মামলা করেছেন সেটির তদন্ত চলছে। মেঘার আত্মহত্যার পেছনে কারও প্ররোচনা থাকলে তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার ঝালকাঠি শহরের পূর্ব চাঁদকাঠি বিআইপি কলোনির পেছনে মাহিবি হাসানের বাড়িতে গেলে দোতলা বাড়ির নিচতলার গেটে তালা লাগানো দেখা যায়।

মাহিবিদের বাড়ির নিচতলার ভাড়াটিয়া স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. গাজী হায়দার বলেন, ‘আমি আমার দুই বোন নিয়ে নিচতলায় ভাড়া থাকি। বাড়ির মালিক নফিসুর রহমান কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তার স্ত্রী সেলিনা বেগম এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে দোতলায় থাকেন। কয়েক দিন ধরে তারা বাড়িতে নেই। তারা কোথায় গেছেন আমরা জানি না। কয়েক দিন ধরে তাদের ঘর তালাবদ্ধ। কোথায় গেছে কাউকে কিছু বলে যায়নি তারা।’

প্রতিবেশীরা জানান, বাবা নফিসুর রহমান মারা যাওয়ার পর বখাটে হয়ে যায় ছেলে মাহিবি হাসান। একাধিক মেয়ের সঙ্গে মাহিবির প্রেমের সম্পর্ক রয়েছ। তার মা এসব দেখলেও বাধা দেন না। তার প্রেমে বলি হলেন ইডেন কলেজের ছাত্রী সায়মা কালাম মেঘা। প্রেমিকা মেঘার মৃত্যুর পর ঘরে তালা দিয়ে মা ও বোনকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন মাহিবি।

মো. আতিকুর রহমান/এএম/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :