আ.লীগের ভরাডুবির নেপথ্যে ভোটারের চেয়ে নেতাকর্মী বেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ১০:০৭ পিএম, ২৫ জুন ২০১৯

উপ-নির্বাচনে বগুড়ায় আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয়েছে। কোন্দলে জর্জরিত দল বিএনপির কাছে হেরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অবস্থান পড়েছে হুমকিতে।

নির্বাচনে ভরাডুবির পেছনে দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সুবিধাভোগী নেতাকর্মীদের দাপট, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জমিদখল ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। এই নির্বাচনে খুব কম ভোট পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনার ঝড়।

বগুড়া শহর আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান আকন্দ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা কোনো কথা বলে বা উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েও বগুড়ার মানুষকে নৌকার পক্ষে আকৃষ্ট করতে পারিনি। এমনকি আমাদের দলের নেতাকর্মীকেও আমাদের পক্ষে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত করতে পারিনি। আমার মনে হয় এটা আমাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতা।’

জেলা ছাত্রলীগের নেতা আহমেদুর রহমান ডালিম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমার জানামতে বগুড়া শহর এবং সদরে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী এবং কিছু বাটপারি সংগঠন রয়েছে। এদের নেতারা যদি নৌকায় ভোট দিতেন তাহলেও টি জামান নিকেতা ভাই এমপি হতে পারতেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য তারা নৌকা মার্কায় ভোট দেননি। তাহলে কি নেতারা শুধু টাকা ইনকাম করা আর আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ কর্মীদেরকে শোষণ করার জন্যই আওয়ামী লীগ করে?’

মানিক হক লিখেছেন, ‘যেদিকে দু’চোখ যায় শুধুই আওয়ামী লীগ। তাহলে ভোটগুলো কোথায় গেল? রাজনীতি যখন ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখন লাখ লাখ নেতাকর্মী থাকা অবস্থায় হাজার হাজার ভোটের ব্যবধানে হারতে হয়। নৌকার পক্ষে যত লোককে ভোট চাইতে দেখেছি তাদের পরিবার ঠিকমতো ভোট দিলে অনায়াসে নৌকার বিজয় হতো।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়া শহর আওয়ামী লীগ গত পাঁচ বছর হলো চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। একই অবস্থা সদর থানা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ক্ষেত্রেও। সদর থানা আওয়ামী লীগের তিন বছরের কমিটির বয়স এখন সাত বছরে গিয়ে ঠেকেছে। এছাড়া যুবলীগ গত আড়াই বছর ধরে তাদের কমিটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারেনি। আর মূল দলসহ অঙ্গ সংগঠনের প্রতিটি কমিটি ও আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে সিলেকশন করে। অর্থাৎ মাঠের ত্যাগী নেতাকর্মীর কোনো সিদ্ধান্ত মানা হয়নি।

১৮ বছর আগে ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া সদর উপজেলায় নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল ৪৬ হাজার। ২০০৮ সালে এই ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৭৪ হাজারে। ২০০৯ সালে উপজেলা নির্বাচনে এই ভোট এসে দাঁড়ায় ৬২ হাজারে। ২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে যা দাঁড়ায় ৫৪ হাজারে। সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট পড়ে মাত্র সাড়ে ৩৭ হাজার। শেষ উপ-নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ভোট পান ৩২ হাজার ২৯৭টি।

অর্থাৎ ১৮ বছরের মধ্যে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ পরপর তিনবার থাকলেও বগুড়ায় আগের চেয়ে ভোট কমে অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। এর কারণ হিসেবে দলের সিনিয়র নেতারা মনে করেন যারা দল করেন তারাই ভোট দেন না। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এ কারণে ভোটের হিসাব নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। ফলে জেলা শহরসহ অন্যান্য উপজেলাগুলোতে ভোটারের চেয়ে নেতাকর্মী বেশি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই এখন রাজনীতির চেয়ে চাঁদাবাজি আর দখল নিয়ে বেশি ব্যস্ত। রাজনীতি নিয়ে বগুড়ায় আওয়ামী লীগের নেতাদের আগ্রহ কম। তাদের প্রয়োজন একটি দলীয় সাইনবোর্ড। একই কারণে দলীয় কার্যালয় বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত কার্যালয় তৈরি করে ব্যস্ত রয়েছেন তারা। চাঁদাবাজি আর সরকারি জমি দখল নিয়েই আছেন কেউ কেউ। এর বাইরে আছে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য।

আগে বগুড়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত মমতাজ উদ্দিন। তার বিপরীতে ছিলেন জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম। এই দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব ছিল অনেক। এখন মমতাজ উদ্দিন বেঁচে নেই। কিন্তুু তার অনুসারীরা মূল দলের একটি পক্ষ হয়ে গেছে। মূল দল ছাড়াও যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একেবারেই প্রকাশ্য। সাধারণ মানুষ এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি বলেই নৌকার পক্ষে ভোট কমছে আশঙ্কাজনকভাবে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান দলীয় কর্মসূচি ছাড়া শহরে আসেন না। তিনি ব্যস্ত শেরপুর শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। দল ক্ষমতায় আসার পর শেরপুরে করতোয়া জুট মিল নামের একটি পাটকল দিয়েছেন তিনি। ছেলের আছে ঠিকাদারি ব্যবসা।

বগুড়া জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার প্যানেল মেয়র শামছুদ্দিন শেখ হেলালের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নেরও সাধারণ সম্পাদক তিনি। শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বগুড়া হয়ে উত্তরবঙ্গ রুটে চলাচলকারী পরিবহন এবং থ্রি-হুইলার অটোরিকশায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়।

এ ব্যাপারে শামছুদ্দিন শেখ হেলাল বলেন, আমরা দলের লোক। দলের জন্য কাজ করি। শ্রমিক সংঠনের জন্য চাঁদা ওঠে। আর বগুড়ার লোক উন্নয়ন চায় না। জনগণকে মিথ্যা কথা বলে তারা ভোট নেয়। উন্নয়ন বাদ দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে ব্যস্ত তারা। এ কারণে ধানের শীষ জয়ী হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি এ কে এম আছাদুর রহমান এখন জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান। এই নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে সিএনজি থেকে চাঁদাবাজি, দখল ও দলীয় নেতাদের খুনাখুনিসহ নানা অভিযোগ।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করলেও ক্ষমতাসীন দল যে এখন সুবিধাবাদী নেতাকর্মীদের অবৈধ টাকা উপার্জনের মাধ্যম হয়েছে সেটি স্বীকার করেছেন তিনি।

জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আছাদুর রহমান বলেন, দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী এখন চাঁদাবাজি, বালু উত্তোলন, দখলসহ নানা অপকর্মে জড়িত। এসব কাজ মানুষের মধ্যে নেগেটিভ সাড়া ফেলেছে। ফলে ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

জানতে চাইলে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী টি জামান নিকেতা বলেন, প্রশাসন এখানে পক্ষপাতিত্ব করেছে। পুলিশের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। প্রশাসন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বিএনপি প্রার্থীর জন্য তারা ভোটের মাঠে কাজ করেছে। এসব বিতর্কিত কারণও নৌকা হারার জন্য দায়ী।

ভরাডুবির কারণ সম্পর্কে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান মজনু বলেন, আমরা সবাই মিলে কাজ করেছি। কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারিনি। এটা মেনে নিতে হবে। আগামীতে আমরা আবারও চেষ্টা করব।

লিমন বাসার/এএম/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :