চামড়ার হাটে ক্রেতা নেই, ফড়িয়াদের মাথায় হাত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ পিএম, ১৮ আগস্ট ২০১৯

টাঙ্গাইলের পাকুটিয়ার চামড়ার হাটে ধস নেমেছে। ফড়িয়ারা যে দামে মফস্বল থেকে চামড়া কিনেছেন তার অর্ধেক দামেও বিক্রি করতে পারছেন না। এতে অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, আগের বছরে কয়েক লাখ চামড়া আমদানি হলেও এবার ৫০ হাজারেরও কম চামড়া আমদানি হয়েছে। যে পরিমাণ চামড়া হাটে উঠেছে সেগুলোও কেনার মত ক্রেতা হাটে আসেনি। হাটে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বল্লা, নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ থেকে ১০-১২টি কোম্পানির এজেন্ট, ছোট-খাটো কয়েকটি ট্যানারির মালিক ও স্থানীয় কয়েকজন ক্রেতা ছাড়া বড় কোনো কোম্পানীর মালিক বা এজেন্টদের সমাগম ঘটেনি।

হাটে আসা ট্যানারি মালিক বা এজেন্টরা জানান, সরকার এ বছর চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক লোন ছাড় করেনি। টাকার অভাবে তারা চামড়া কিনতে পারছেন না। সরকার চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। স্থানীয়ভাবে চামড়া কিনতে হবে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা বর্গফুট। ওই দামে ফড়িয়ারা চামড়া বিক্রি করছে না।

চামড়া না কেনার কারণ হিসেবে তারা জানান, হাট থেকে চামড়া কিনে প্রত্যেকটি চামড়া প্রতি আরও অতিরিক্ত ২০০ টাকা খরচ হবে। এর মধ্যে ট্রান্সপোর্ট, লবণ, শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচও যুক্ত হবে। ফলে হাট থেকে কেনা চামড়ার দাম ঢাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি পড়বে।

হাটে আসা ঢাকার কেরানীগঞ্জের ইউসুফ লেদার কর্পোরেশনের মালিক মো. ইউসুফ হোসেন জানান, তিনি বেছে-বেছে মোটা ও প্রথম শ্রেণির গরুর চামড়া কিনতে এসেছেন। উল্টে-পাল্টে চামড়া দেখছেন ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দাম-দর করছেন।

জামালপুরের মেলান্দ থেকে মৌসুমী ব্যবসায়ী জগাই তার প্রতিটি চামড়ার দাম হাঁকছেন ১২০০ থেকে ১৪৫০ টাকা। চামড়া দেখা শেষে ইউসুফ হোসেন দাম বলছেন ৫০০ থেকে ৫৮০ টাকা। বনিবনা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মফস্বল থেকে সংগ্রহ করা চামড়া জগাই বিক্রি করতে পারেননি।

Tangail-Leather-pic-01

কালাম ট্যানারির এজেন্ট আহাম্মদ বাদশা, মঞ্জু ট্যানারির এজেন্ট দীন ইসলাম, হক ট্রেডার্সের এজেন্ট মো. সাইদুল হক, মাসুদ ট্যানারির এজেন্ট ফরিদুজ্জামান, আরকে লেদার কোম্পানির এজেন্ট মো. মাসুম মিয়াসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির এজেন্টদের অভিযোগ, মৌসুমী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা যে মাত্রায় দাম হাঁকছেন তাতে চামড়া কেনা সম্ভব নয়। তাদের বাজেটের চেয়েও দুই-তিনগুণ বেশি দাম হাঁকছেন ফড়িয়ারা।

অপরদিকে ফড়িয়া, খুচরা ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা জানান, তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বা স্থানীয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ করে প্রতি পিস চামড়ার পেছনে খরচ পড়েছে গড়ে ৭৫০ টাকা থেকে ৯০০টাকা। সেখানে মহাজন ও ট্যানারি মালিক ও এজেন্টরা দাম বলছেন ৫০০ টাকা থেকে ৬৮০ টাকা। অনেকেই ২০০ থেকে ৬০০ পিস করে চামড়া নিয়ে হাটে এসেছেন। প্রতি পিস চামড়ায় লাভের পরিবর্তে ৯০ থেকে ২২০ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এমন আকাশ-পাতাল তফাৎ হলে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব নয়।

তারা জানান, এ ব্যবসায় সারা বছর উপার্জন করা সম্ভব হয় না। বুক ভরা আশা নিয়ে ঈদুল আজহার দিকে চেয়ে থাকতে হয়। এ হাটে চামড়া বিক্রি করে কিছুটা লাভ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার আশায়। এ বছর লাভ তো দূরের কথা চামড়া এবার তাদের পথে বসাবে। তাদের অনেকে মানুষের কাছে ধার-দেনা করে বা সুদে টাকা নিয়ে চামড়া কিনেছেন। এখন চামড়ায় যে ক্ষতি হচ্ছে- তাতে এ ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে। সুদ ও ধার করা টাকা পরিশোধ করতে না পারলে গলায় রশি দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তাদের।

পাকুটিয়ার চামড়ার হাটের ইজারাদার হুমায়ুন ও রফিক জানান, চামড়ার বাজারে ধস নামায় তারাও বিপাকে পড়েছেন। চাহিদা মত চামড়া আমদানি ও বেচা-কেনা না হওয়ায় তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

তাদের অভিযোগ, চড়া মূল্য দিয়ে হাট ইজারা নিতে হয়েছে। পক্ষান্তরে দিন-দিন মানুষ চামড়া ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে পাট শিল্পের মতোই চামড়া শিল্পও কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

এ বিষয়ে ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম জানান, সারাদেশের মতো টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়ার হাটেও চামড়ার দামে প্রভাব পড়েছে। ইতোমধ্যে সরকার চামড়া শিল্পকে রক্ষার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যেহেতু ঈদের পর আজই প্রথম হাট বসেছে তাই পুরো বিষয়টি নিয়ে হাট মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

আরিফ উর রহমান টগর/আরএআর/জেআইএম