আমাদের জন্য সাহায্য এনে খেয়ে ফেলে জনপ্রতিনিধিরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝিনাইদহ
প্রকাশিত: ০৯:৩২ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০১৯

ঝিনাইদহে গড়াই নদীর ভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন নদী পাড়ের বাসিন্দারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে নদীর ভাঙন প্রতিরোধের আশ্বাস দেয়া হলেও নেয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ।

গড়াই নদী ঝিনাইদহের শৈলকুপা অংশে প্রায় ২২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রবাহিত। উপজেলার নদী তীরবর্তী বড়ুলিয়া, কৃষ্ণনগর ও নলখোলাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে প্রতি বছর নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন শুরু হয়। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ আকার ধারণ করে ভাঙন।

কয়েক বছরের ভাঙনে বড়ুলিয়া গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাতারাতি বদলে যায় গ্রাম ও মানুষের ভাগ্যের চিত্র। চলতি বছরের অনেক মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছেন, অনেক বাড়িঘর হুমকিতে রয়েছে। ভাঙন থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, শ্মশান ঘাট ও ফসলি জমি।

Shailkupa-River-Break-

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি কাজে দু’দফায় দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ আসে। তা দিয়ে বাঁশের বেড়া তৈরি করে কিছু বালুর ব্যাগ ফেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে ভাঙন প্রতিরোধ কাজ।

তবে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ওই বছরেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় বাঁশের বেড়া। এরপর ভাঙন রোধে কোনো কাজ করা হয়নি। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য, পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। দিয়েছেন ভাঙন রোধের আশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি।

বড়ুলিয়া গ্রামের গৃহবধূ রাশিদা বেগম বলেন, আমাদের আট বিঘা জমি ছিল। নদীতে সব চলে গেছে। এখন একটু দূরে তিন কাঠা জমির ওপর ঘর করে বসবাস করছি। রাতে ঘুম হয় না। সবসময়ই ভয়ে থাকি কখন ঘরটি নদীর পেটে চলে যায়।

Shailkupa-River-Break-

একই গ্রামের নুরজাহান বেগম বলেন, আমাদের এমন অবস্থা দিনের পর দিন চলছে, কেউ এগিয়ে আসে না। নেতারা ভোটের সময় এসে বলে আমাকে ভোট দাও জিতলে নদীভাঙন রোধে কাজ করব। ভোটের পর জিতে গেলে তাদের কোনো খোঁজ থাকে না। সবার হাত-পা ধরি। কিন্তু কেউ আমাদের দিকে তাকায় না। আমাদের সাহায্য না দিয়ে সব খেয়ে ফেলে জনপ্রতিনিধিরা। নেতারা আমাদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, এসব কি আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেখেন না?। আমাদের অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি যেন আমাদের দিকে তাকান। আমাদেরকে বাঁচান প্রধানমন্ত্রী।

বড়ুলিয়া গ্রামের বাসিন্দারা জানান, তাদের কারও কারও বাড়ির উঠানে ফাটল। নদী চলে এসেছে ঘরের পাশে। নদীর স্রোতের তীব্রতা দেখে মনে হয় এবারের পর আর বাড়িতে থাকা যাবে না। কারণ পানি কমতে শুরু করেছে। এরপরই শুরু হবে ভাঙন। এতেই নদীগর্ভে চলে যাবে তাদের ঘরবাড়ি।

তারা জানান, ১৯৯০ সালের পর থেকে নদীভাঙন চলছে। এখন আরও বেশি ভাঙছে। গত কয়েক বছরে এলাকা ছেড়েছেন অনেকেই। বেশির ভাগ মানুষ রাস্তায় কিংবা অন্যের জায়গা আশ্রয় নিয়েছেন। নদীভাঙনে সব হারিয়ে তারা সবাই এখন নিঃস্ব।

Shailkupa-River-Break-

সারুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান মামুন বলেন, ২০১৪-২০১৫ সালে সরকারের কাছ থেকে বড় প্রকল্প আনার জন্য কিছু কাজ করা হয়েছিল। পরে আর কাজ করা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীভাঙন রোধে কাজ করে না বলেই জনগণের কাছে আমাদের হেনস্তা হতে হয়। জনগণ ভাবে আমরা সব খেয়ে ফেলেছি। আসলে এসব অভিযোগ ঠিক না।

শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ওই এলাকার নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Shailkupa-River-Break-

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী তৌফিক উজ জামান বলেন, নদীভাঙন স্থায়ী প্রতিরোধে ২৪২ কোটি টাকার প্রজেক্ট চলতি বছরের জুলাই মাসে সাবমিট করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। গড়াই নদীর শৈলকুপা অংশের জন্য পৃথক ১৮০ কোটি টাকার প্রস্তাবনা থাকায় এটি পাস হতে দেরি হচ্ছে। বিলটি অধিদপ্তর হয়ে একনেকে পাস হলেই কাজ শুরু হবে।

তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে পর থেকে নদীভাঙনে তিন হাজার ৫০০ বিঘা জমি চলে গেছে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ভেতরে। অন্য জেলার ভেতর হওয়ায় এসব চরের দখল নিতে পারেছে না ভিটেহারা শৈলকুপা উপজেলার বাসিন্দারা।

আব্দুলআহ আল মাসুদ/এএম/জেআইএম