পোকায় দিশেহারা কৃষক, খোঁজ নেই কৃষি কর্মকর্তার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝিনাইদহ
প্রকাশিত: ০৫:৪২ পিএম, ২৯ অক্টোবর ২০১৯

ঝিনাইদহের বিভিন্ন স্থানে আমন ধান গাছে বাদামি গাছ ফড়িং বা কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দেয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। গত কয়েকদিনে জেলার সব উপজেলায় মাঠের পর মাঠে এর পোকার আক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। পোকার আক্রমণে অনেক জমির ধান শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে চলতি মৌসুমে আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এদিকে এই আপদকালীন সময়ে কৃষি অফিসের কোনো কর্মকর্তা পাশে পচ্ছেন না কৃষকরা। তবে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সকাল-বিকেল খোঁজ নিয়ে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। যদিও জেলার কৃষি অফিসগুলো বলছে, কারেন্ট পোকার আক্রমণ হলেও তা নিয়ন্ত্রণে আছে। ফলে ধানের ফলনে কোনো সমস্যা হবে না। তারা চাষীদের ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন।

দেখতে ছোট ছোট বাদামি পোকার মতো এই ফড়িং ধান গাছের রস চুষে নেয়। ফলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গাছ মরে হলুদ বর্ণ ধারণ করছে। এ পোকা প্রথমে ধান গাছের গোড়ায় আক্রমণ করায় কীটনাশক ছিটিয়েও দ্রুত দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো এলাকায় আক্রমণ করলে দুয়েক দিনের মধ্যে তা দ্রুত মাঠের পর মাঠ ছড়িয়ে পড়তে পারে। যে কারণে এটিকে অনেকেই কারেন্ট পোকা বলেন।

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি রোপা আমন মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় ১ লাখ ৫ হাজার ৬৪৬ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু চাষ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে বেশি চাষ হয়েছে স্বর্ণা জাত। এছাড়াও রয়েছে ব্রি-৪৯ জাত। কৃষি বিভাগের হিসেবে চাষকৃত জমি থেকে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৪৩ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হবে। যা থেকে পাওয়া যাবে ৩ লাখ ৫৮৮ মেট্রিক টান চাল। একর প্রতি ৪৫ মণ উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য কৃষকরা বলছেন, পোকার আক্রমণ দমন করা না গেলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে না।

Jhenaidah-2.jpg

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা চলতি মৌসুমে উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ করে ধান চাষ করেছিলেন। সঠিক পরিচর্যা ও রোগ বালাই দমনে বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে ধানের ফলন আসতে শুরু করেছে। কোনো কোনো জমিতে শীষ বের হয়েছে। কিছু কিছু জমিতে ধান পাকতেও শুরু করেছে। কিন্তু হঠাৎ কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দেয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

সরেজমিনে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে মাঠের পর মাঠে শত শত হেক্টর জমিতে এই পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মাঠের পর মাঠে পোকার আক্রমণ হলেও সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা মাঠকর্মীর দেখা মিলছে না। গত কয়েকদিনে কৃষি অফিসের কাউকে দেখা যায়নি। ফলে তাদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা পাচ্ছেন না তারা।

এ অবস্থায় বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রতিদিন সকাল-বিকেল এসে খোঁজ নিচ্ছেন। কোন ওষুধ দিতে হবে, কী পরিমাণ দিতে হবে- তা দেখিয়ে দিচ্ছেন- এমনটাই বলছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কৃষি কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তারা ইউনিয়ন ও মাঠ পর্যায়ে রোগবালাই প্রতিরোধ ও দমনে নানা কৌশল এবং ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে কৃষকদের ধারণা দিয়ে উঠান বৈঠকে লিফলেট বিতরণ করেছেন।

Jhenaidah-2.jpg

কালীগঞ্জ উপজেলার উল্লাহ গ্রামের কৃষক ফিরোজ হোসেন জানান, এ বছর ১৪ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। সব জমিতে থোড় বা শীষ বের হচ্ছে। অনেক জমিতে শীষ বের হওয়া শেষ হয়েছে। এমন সময় হঠাৎ পোকার আক্রমণের কারণে সব জমিতে ওষুধ দিতে হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক দিনে কোনো কৃষি কর্মকর্তার দেখা মেলেনি। তবে, বায়ার ও সিনজেন্টা নামে দুটি কীটনাশক কোম্পানির প্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভিটশ্বর গ্রামের কৃষক শরিফুর ইসলাম ও মন্টু দফাদার জানান, পোকার আক্রমণের পর থেকে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা প্রতিদিন গ্রামের মোড়ে মোড়ে এসে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো কৃষি কর্মকর্তা এলাকায় আসেননি।

এদিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানীতেও দেখা দিয়েছে কারেন্ট পোকার আক্রমণ। এতে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে মাঠের পর মাঠের ধান গাছ। চরম উৎকণ্ঠায় আছেন কৃষকরা।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক আব্দুর রউফ জানান, দিনে গরম, রাতে শীত এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে এই পোকার আক্রমণ বাড়ে। তবে আমরা শুরু থেকে গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক ও হাজার হাজার লিফলেট বিতরণ করে কৃষকদের সচেতন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ধানের দাম কম হওয়ায় প্রথমে কৃষকরা গুরুত্ব দেয়নি। তবে, কারেন্ট পোকার আক্রমণ বেশি হলেও তা নিয়ন্ত্রণে আছে বলে দাবি করেন তিনি।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ/এমএমজেড/এমএস