বিতর্কিত ওসি মোয়াজ্জেমের যত অপকর্ম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফেনী
প্রকাশিত: ০৮:০৮ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০১৯
ফাইল ছবি

সোনাগাজী মডেল থানা থেকে প্রত্যাহারের পর বরখাস্ত হওয়া ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন দেশজুড়ে বিতর্কিত। তিনি এখন দেশবাসীর কাছে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। সোনাগাজী মডেল থানা থেকে প্রত্যাহারের পর শাস্তিমূলক রংপুরে সংযুক্ত করা হলেও সেখানকার ছাত্রসমাজ তাকে জুতা প্রদর্শন করে অবাঞ্ছিত ও প্রতিহতের ঘোষণা দেয়।

মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অপরাধে তাকে ৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া নুসরাতকে বর্বরোচিতভাবে হত্যার বিষয়টিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টার ঘটনায় পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে পুলিশ সদর দফতরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে তার এসব অপকর্ম নতুন কিছু নয়। এর আগেও ফেনী মডেল থানা ও ছাগলনাইয়া থানা থেকে প্রত্যাহার হয়েছিলেন অর্থলোভী এ পুলিশ কর্মকর্তা। কুমিল্লার একাধিক থানায় কর্মরত থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে ছিল অভিযোগের স্তূপ। তার সঙ্গে জামায়াতের কানেকশন ছিল বলে সে সময় ফেনীর একাধিক পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে ওসি মেয়াজ্জেমের কুকর্মের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করে ফেনীবাসী। ফেনী মডেল থানায় কর্মরত অবস্থায় নানা অপকর্ম করেছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, জুনিয়র অফিসারদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে তাদের দিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন ওসি মেয়াজ্জেম।

২০১৩ সালে ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের সুপার মার্কেটের এক ব্যবসায়ীকে থানায় ধরে নিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। পরে তদন্তে ঘটনার সত্যতা মেলায় এক এসআইকে প্রত্যাহার করা হয়। কিছুদিন পর জামায়াত কানেকশনের তথ্য ফাঁসের পর ফেনী ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। অভিযোগ ছিল, অর্থের বিনিময়ে তাদের কর্মসূচি পালনের সুযোগ দিতেন তিনি।

২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর ছাগলনাইয়া থানায় যোগদান করেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। সেখানে ৩২টি স্বর্ণের বারসহ এক চোরাকারবারীকে আটক করা হয়। ১২টি স্বর্ণের বার জব্দ তালিকায় দেখিয়ে ২০টি আত্মসাৎ করার চেষ্টা চালান তিনি। খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে থানায় যান তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল হক। তিনি চোরাকারবারির দেহ তল্লাশি করে আরও ২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করেন। সে সময় স্বর্ণ চুরির বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন ওসি মোয়াজ্জেম।

ছাগলনাইয়ার পশ্চিম দেবপুরে বোমা বিস্ফোরণে শিশু আলম আহতের ঘটনায় উল্টো তার পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ওসি মোয়াজ্জেম নিরীহ পরিবারটিকে মামলার জালে আটকে দেন, যা পত্রিকায় প্রকাশের পর তৎকালীন পুলিশ সুপারের নজরে এলে তার নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল হক সরেজমিন তদন্ত করেন। পরে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে। একপর্যায়ে আহত শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা নিতে বাধ্য হন তিনি।

গত বছরের ৩১ আগস্ট রাতের অন্ধকারে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে নবদম্পতিকে আটক করতে গিয়ে তার নির্দেশে ফেনীর নিচিন্তা গ্রামে লঙ্কাকাণ্ড ঘটায় পুলিশ। এক বয়োবৃদ্ধের চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গালে চড় মারার ঘটনায় এলাকায় অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওসি গ্রামের নিরীহ লোকজনকে আসামি করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেন।

দারোগাবাজার এবং নিজপানুয়া এলাকার দুই প্রবাসীকে মামলার ভয় দেখিয়ে ৬০ হাজার টাকা লুটে নেয়ার ঘটনাও এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। জুতা পালিশ করে মুচির টাকা না দেয়ার ঘটনাও দাগ কাটে এলাকাবাসীর মনে। সর্বশেষ থানায় যাতায়াতের রাস্তায় দোকান বসিয়ে বেকায়দায় পড়েন ওসি মোয়াজ্জেম।

তৎকালীন নবাগত পুলিশ সুপার রেজাউল হক যোগদানের পর থেকে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তার কাছে জমা পড়ে। এসপি যোগদানের পর ছাগলনাইয়া থানায় প্রথম ওপেন হাউস ডে সভায় ওসি মোয়াজ্জেমের মুখোশ উন্মোচন হয়ে পড়ে। এসপির নজরে আসে ওসির অপকর্মের আসল চিত্র। কয়েক মাস ধরে ওসির প্রত্যাহার এবং তার শাস্তির দাবিতে ছাগলনাইয়া ফুঁসে ওঠে সাধারণ জনগণের পাশাপাশি খোদ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও। ছাগলনাইয়ার মহামায়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ওসির শাস্তির দাবিতে ছাগলনাইয়া-পরশুরাম সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে।

ওসি মোয়াজ্জেমের নির্যাতনের শিকার নিচিন্তা গ্রামের হাজার হাজার নিরীহ লোকজন তার বিরুদ্ধে স্থানীয় (ফেনী-১) সংসদ সদস্য শিরীন আখতারের কাছে একাধিকবার নালিশ দিয়ে শাস্তির দাবি করেন। এ বিষয়ে তারা খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বরাবরও লিখিত অভিযোগ দেন। একপর্যায়ে তাকে ছাগলনাইয়া থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

দীর্ঘদিন পুলিশ লাইনে ও পরবর্তীতে কুমিল্লায় বদলী হওয়ার পর ২০১৮ সালের শুরুতে সোনাগাজী মডেল থানায় যোগ দিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তার ঘুষ-দুর্নীতির প্রতিবাদে মাঠে নামেন। কোনো প্রতিকার না পেয়ে তারাও চুপসে যান। তার সময়কালে সোনাগাজীতে চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ অন্য সময়ের তুলনায় বেড়ে যায়। চোর-ডাকাত, মাদক বিক্রেতাসহ অপরাধীদের সঙ্গে তার গভীর সখ্য ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে কুমিল্লায় কর্মরত থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতার নিকটাত্মীয় পরিচয় দিলেও আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এর কোনো সত্যতা নেই।

সর্বশেষ কর্মস্থল সোনাগাজী মডেল থানায় গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের পরিবার থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওসি মেয়াজ্জেম অশ্লীলভাবে জেরা করে ভিডিও ধারণ করেন। পরবর্তীতে সে ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে দেন।

পরে ১৫ এপ্রিল উচ্চ আদালতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। পরে ২৭ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ওই দিন আদালত ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

গত ১৬ জুন রাজধানীর শাহবাগ থেকে তাকে (মোয়াজ্জেম হোসেন) গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন ১৭ জুন আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ১৭ জুলাই বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস-শামস জগলুল হোসেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ২০ নভেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়। এ মামলায় ১২ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।

বৃহস্পতিবার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের ৮ বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় দেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস-শামস জগলুল হোসেন।

রাশেদুল হাসান/এমবিআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]