পঞ্চগড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের রত্নগর্ভা মায়েদের সম্মাননা প্রদান

সফিকুল আলম
সফিকুল আলম সফিকুল আলম , জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ০৬:৪৩ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২০

যাদের অনুপ্রেরণায় জাতির সূর্যসন্তানরা হানাদারদের পরাজিত করে ছিনিয়ে এনেছেন লাল সবুজ পতাকা। বুকে পাথর বেঁধে যারা আদরের সন্তানদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছেন। যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে বুকের ধনকে হারিয়ে এখনও বেঁচে আছেন, তাদের কেউ খোঁজ রাখেন না। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের মায়েদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ‘রত্নগর্ভা মা’ সম্মননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।

শুক্রবার সকালে সম্মাননা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বয়সে ৮০ পেরিয়েছে এমন রত্নগর্ভা মায়েরা একে একে জড়ো হন পঞ্চগড় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে। অনুষ্ঠানে জেলার পাঁচ উপজেলায় বেঁচে থাকা ৩৭ জন মায়ের গায়ে চাদর জড়িয়ে দেন, হাতে ফুল, শাড়ি, সম্মাননা ক্রেস্ট, সনদসহ উত্তরীয় পরিয়ে দেন অতিথিরা। জীবনের শেষ মুহূর্তে এমন ভালোবাসা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন রত্নগর্ভা মায়েরা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন উপলক্ষে জেলায় ৪০ জন রত্নগর্ভা মাকে এ সম্মানা দেয়া হয়।

Panchagarh-Mother

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘রত্নগর্ভা মা’ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কে.এম তারিকুল ইসলাম। এতে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদাত সম্রাট, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার নাঈমুল হাছান, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী আব্দুল আলিম খান ওয়ারেশী, পৌরসভার মেয়র মো. তৌহিদুল ইসলাম, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ওয়ায়সুল কোরায়সী বিশেষ অতিথি ছিলেন।

এর আগে জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন প্রেসব্রিফিংয়ে মুজিব বর্ষ উপলক্ষে গৃহীত কর্মসূচি তুলে ধরেন। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধুকে জানো’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু কর্ণারে রক্ষিত বই নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে বুক রিভিউ প্রতিযোগিতা, বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত দুই বাংলার কবিদের কবিতা সঙ্কলন প্রকাশ, পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা বাধ সংলগ্ন এলাকায় সোনার বাংলা নামে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক স্থাপন, যেসব এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক নেই বিশেষ করে সুবিধা বঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, পাথরভাঙ্গা শ্রমিক, চা শ্রমিক, বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান, হাফিজাবাদ ইউনিয়নের খালপাড়া গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ ঘোষণা, পুর্নবাসনের মাধ্যমে পঞ্চগড় জেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা, মার্চের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎতায়ন জেলা ঘোষণা, শতভাগ স্কাউট জেলা ঘোষণা, জেলার এক লাখ শিক্ষার্থীকে ‘এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’ স্লোগান সম্বলিত এক লাখ ছাতা বিতরণ, বছরব্যাপি জারি, সারি, পালা ও কবিগানসহ সাংস্কৃতিক উৎসবের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

Panchagarh-Mother-1

এদিকে বিকেলে সার্কিট হাউজ চত্ত্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালে পুস্পস্তবক অর্পণ শেষে বর্ণাঢ্য র্যালি নিয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে ক্ষণগণনার কর্মসূচি বড় পর্দায় প্রদর্শন, প্রধানমন্ত্রী কর্র্তৃক ক্ষণগণনা যন্ত্র উদ্বোধন, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধানের মা নাজমা খাতুন (৮৭) বলেন, আমার ছেলে আমাকে না বলেই যুদ্ধে চলে যায়। তবে কখনও ভাবিনি ছেলের জন্য আমাকে সম্মান জনানো হবে। মা হিসেবে ওর মতো সন্তান জন্ম দেয়াটা আজ সার্থক হলো। এভাবে মায়েদের সম্মান জানালে দেশের প্রতি অন্য সন্তানদেরও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে।

Panchagarh-Mother-2

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন বলেন, এতদিন আমাদের নানাভাবে সম্মাননা দেয়া হতো। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর আমাদের মায়েদের খোঁজ করা হলো। আমাদের জেলা প্রশাসক একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধান সন্তান বলেই তিনি এমন আয়োজন করেছেন। আশা করি অন্য জেলাতেও আমাদের মায়েদের এমন সম্মাননার আয়োজন করা হবে।

জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আমি একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। জন্মের পর আমি আমার বাবাকে দেখিনি। তবে মায়ের কষ্টটা অনুভব করেছি। সেই চেতনা থেকেই বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীর ক্ষণগণনা উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের মায়েদের এমন সম্মাননা দেয়ার আয়োজন করেছি। আমার মনে হয়েছে নিজের সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানো মায়েদের অবদানও দেশের জন্য কম নয়। সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে তারা যেমন প্রতিনিয়ত নানা শঙ্কায় ছিলেন। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মায়েদের এ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।

সফিকুল আলম/এমএএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]