উদ্বেগ বাড়াচ্ছে কিশোর অপরাধ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ১১:৪৫ এএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২০
ফাইল ছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কিশোর গ্যাংয়ের কোনো অস্তিত্ব এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ। তবে দিন দিন বাড়ছে কিশোর অপরাধীদের সংখ্যা। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারি, চুরি, ছিনতাই ও যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। জেলায় কোনো কিশোর সংশোধনাগার না থাকায় বাধ্য হয়েই অনেক অপরাধীকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে পুলিশ। কিছু অপরাধীকে মামলায় চালান দিয়ে আদালতে পাঠানো হলেও বয়স বিবেচনায় জামিন পেয়ে আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে তারা। এতে কিশোর অপরাধীরা পুলিশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলা পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, বাসা-বাড়িতে চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিংসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ত কিশোর অপরাধীরা। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা কিশোরদের ব্যবহার করছে মাদক পরিবহনের কাজে। আর টাকার লোভে কিশোররাও মাদক কারবারিদের ফাঁদে পা দিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে এসব কিশোরদের কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছে মাদক কারবারেও।

গত ২০১৭ সালে মারামারি, চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের ২৬টি মামলায় ৩৮ জন, ২০১৮ সালে ৫০টি মামলায় ৫২ জন ও ২০১৯ সালে ৫০টি মামলায় ৬৮ জন কিশোরকে আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। তাদের বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। এছাড়াও অর্ধশত কিশোরকে আটকের পর অপরাধের ধরণ ও মাত্রা বিবেচনা করে তাদের পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মামলায় চালান করা বেশির ভাগ কিশোরকে আদালতের নির্দেশে গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আর বাকিরা জামিনে রয়েছে বলে জানা গেছে।

জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় কিশোর অপরাধীর সংখ্যা দিন-দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করেও অনেক কিশোর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শহরের পাড়া-মহল্লার বাসা-বাড়িতে চুরি, ছিনতাই ও ইভটিজিংসহ নানা অপরাধের দায়ে প্রায়ই এসব কিশোর অপরাধীদের আটক করে পুলিশ। কিছু অপরাধীকে আদালতের নির্দেশে সংশোধনের জন্য সমাজ সেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ আটক কিশোরদের মামলা না দিয়ে জেলা শহরে থাকা সরকারি শিশু পরিবারে পাঠাতে চাইলেও তাদেরকে নিতে অনীহা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। পুলিশ তখন বাধ্য হয়েই মুচলেকা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়। আর পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আবারও অপরাধ করে বেড়ায় তারা। এতে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কিশোর অপরাধীদের। ফলে বিপাকে পড়েছে পুলিশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাসুদুল হাসান তাপস বলেন, কোনো কিশোরের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা থাকলে আদালতের নির্দেশে তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। আমাদের শিশু পরিবারগুলোতে সরকারি খরচে এতিম শিশুদের লালন-পালন করা হয়। সেখানে কোনো কিশোর অপরাধীকে আমরা রাখতে পারি না। দুই-তিন দিনের জন্য রাখতে হলে তাদের জন্য চট্টগ্রামে আমাদের সেফ হোম রয়েছে।

রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধে জড়ানোর বিষয়টি স্বীকার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি সুজন দত্ত বলেন, কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না বলেই অপরাধ এবং অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনকেই কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অপরাধ জগৎ থেকে কিশোরদের ফিরিয়ে আনতে তাদের পরিবারকেই প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।

জেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি পীযূষ কান্তি আচার্য বলেন, কিশোর অপরাধ একটি মানসিক সমস্যা। যারা এসব সমস্যায় ভুগছে তাদের বেশির ভাগই স্কুলছাত্র। সেজন্য প্রতিটি স্কুলে মনোরোগ চিকিৎসক নিয়োগ করা প্রয়োজন। আর অপরাধে সাজা নয়, সংশোধনাগারে রেখেই কিশোরদের ভুলগুলো শুধরে নেয়ার সুযোগ দিয়ে তাদেরকে সমাজ ও দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১নং আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) তাসলিমা সুলতানা খানম নিশাত বলেন, কিশোরদের দিয়ে অপরাধ করানো খুব সহজ। আর যারা অপরাধ করছে তারা একেবারেই নিম্ন পরিবারের। যেহেতু বয়স কম তাদেরকে আদালত থেকে জামিন দেয়া হয়। কারণ জেলায় কোনো সংশোধনাগার নেই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মুহাম্মদ আলমগীর হোসেন বলেন, আইন দিয়ে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কী কারণে কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে সেটি আগে খতিয়ে দেখতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় পারিবারিক বঞ্চনা, নিম্ন আর্থ-সামজিক ব্যবস্থা এবং সঙ্গ দোষে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তারা। বাবা-মাসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কিশোর অপরাধ দমন সম্ভব নয়।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/এমএস