আধুনিক অবকাঠামোর সরকারি হাসপাতালটিতে কিছুই নেই!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ১০:১৬ এএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এক বছরেরও বেশি সময় আগে উদ্বোধন হয়েছে। কিন্তু এখনও প্রয়োজনীয় কোনো যন্ত্রপাতি আসেনি সরকারি এ হাসপাতালটিতে। সরকারিভাবে চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় লোকবলও নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে আধুনিক অবকাঠামোর এই হাসপাতালটি অনেকটা অকেজো এবং অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর এলাকায় তিন একর জায়গা নিয়ে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ শুরু হয়। চারতলা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন ও চিকিৎসকদের জন্য কোয়ার্টার নির্মাণে ব্যয় হয় ২৫ কোটি টাকা। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উদ্বোধন করেন।

আধুনিক অবকাঠামোর এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে শিশু ওয়ার্ড, নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডসহ কেবিন এবং তিনটি অস্ত্রোপচার কক্ষ রয়েছে। কিন্তু এতসব থাকার পরও শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় লোকবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে রোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালু করা যাচ্ছে না। ৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২০টি শয্যা ও কিছু আসবাবপত্র এসেছে। কিন্তু চিকিৎসার যন্ত্রপাতি না আসায় সেগুলোও তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে স্টোর রুমে। সরকারিভাবে লোকবল নিয়োগ না হওয়ায় হাসপাতালটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অস্থায়ীভাবে পাঁচজন কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

রোগীদের টিকিট ফির টাকা থেকে তাদের বেতন দেয়া হচ্ছে। আর সর্দি-কাশি ও জ্বর-চুলকানির মতো ছোট-খাটো রোগের চিকিৎসা দিতে বিভিন্ন ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে আটজন চিকিৎসক আনা হয়েছে। জেলার অন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ থেকে কিছু ওষুধ এনে রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।

বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লক্সটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে সংশ্লিষ্ট দফতরে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় লোকবলসহ ৮২টি পদে লোকবল নিয়োগের চাহিদাপত্র দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়। এর মধ্যে মাত্র ৪৬টি পদের অনুমোদন দেয়া হয়। হাসপাতাল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার আগেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর পাঠানো চিঠির প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ৬ জানুয়ারি ৪৬টি পদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করে দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ওই ৪৬ পদের নিয়োগ প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। হাসপাতালটি উদ্বোধনের এক বছর পার হলেও এখনও পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কোনো যন্ত্রপাতিও দেয়া হয়নি। ফলে হাসপাতালের সবকটি ওয়ার্ড, কেবিন ও অস্ত্রোপচার কক্ষ তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

Bijoynagar-healt-complex-2

বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্থায়ী ভিত্তিতে ওষুধ বিতরণের কাজ করা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা অস্থায়ী ভিত্তিতে পাঁচজন কাজ করছি। এর মধ্যে আমি ওষুধ বিতরণ, আরেকজন টিকিট কাউন্টারে, দুইজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং একজন চিকিৎসকের সঙ্গে থাকেন। এখানে ছোট-খাটো রোগের ওষুধ বিতরণ ছাড়া কিছুই হচ্ছে না। সব ওয়ার্ড, কেবিন ও অস্ত্রোপচার কক্ষ তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আমাদের বেতনও দুই-তিন মাস পরপর দেয়া হয়। সরকারিভাবে নিয়োগের আশায় আমরা অল্প বেতনে কাজ করছি।

তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটি সচল রাখতে সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসকদের দিয়ে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। এখানে প্রতিদিন ৫০-৬০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন। তবে ছোট-খাটো রোগের সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না স্থানীয়রা।

কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এতো বড় হাসপাতাল ভবন অথচ আমাদের চাহিদা মতো সেবা দিতে পারছে না। চিকিৎসার জন্য আমাদের জেলা সদরেই যেতে হচ্ছে। তাহলে এ হাসপাতাল দিয়ে লাভ কী? সর্দি-কাশির মতো রোগের ওষুধ দেয়ার জন্য তো আর হাসপাতাল হয়নি। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করার এক বছর পার হলেও হাসপাতালে কিছুই আসেনি। দ্রুত হাসপাতালটিতে চিকিৎসকসহ সকল যন্ত্রপাতি দেয়ার দাবি জানান তারা।

বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. হামিদা মোস্তফা বলেন, আমার পোস্টিং চম্পকনগর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। যেহেতু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক নিয়োগ হয়নি তাই আমাকে এখানে রোগীদের সেবা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে সেবা দেয়ার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধুমাত্র জ্বর-কাশির মতো ছোটখাটো রোগের চিকিৎসাই আমরা করছি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহ আলম বলেন, বিজয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি একটি আধুনিক স্থাপনা। কিন্তু সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন না হওয়া এবং যন্ত্রপাতির অভাবে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরে একাধিকবার চিঠি চালাচালি করেছি। আশা করছি অচিরেই এসব সমস্যা সমাধান করে রোগীদের পূর্ণাঙ্গ সেবা দেয়া সম্ভব হবে।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/জেআইএম