এক ব্যক্তি দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ১২:১৯ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কুড়িগ্রামে সাবেক ছিটমহল দাশিয়ারছড়ায় একই ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাকরি দেয়ার নাম করে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে। ছিটমহল বিনিময়ের পর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সবচেয়ে বড় ছিটমহল দাশিয়ারছড়ায় গড়ে ওঠে বেসরকারিভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২০১৬ সালে শেখ ফজিলাতুন্নেসা দাখিল মাদরাসা গড়ে তোলেন ছিটমহলবাসী। দাশিয়ারছড়ার কালিরহাট এলাকায় স্থাপিত শেখ ফজিলাতুন্নেসা দাখিল মাদরাসায় সুপার হিসেবে যোগদান করেন আমিনুল ইসলাম। অথচ তিনি ২০০০ সালে একই উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের মধ্যকাশিপুর দ্বি-মুখী দাখিল মাদরাসায় সহকারী মৌলভী হিসেবে যোগদান করেন।

আমিনুল ইসলাম ২০০৪ সালে এমপিওভুক্তি হওয়ার পর মধ্যকাশিপুর দ্বি-মুখি দাখিল মাদরাসা থেকে বিল-ভাতাসহ সুযোগ সুবিধা পেয়ে আসছেন। দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার বিষয়ে ২০১৮ সালে প্রশাসনের নিকট স্থানীয়দের একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। সেই তদন্ত কমিটির কাছে আমিনুল ইসলামের দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমিনুল ইসলাম দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। চাকরি দেয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ, মাদরাসার জমি নিজ নামে দলিল করাসহ নিজের বাবাকে সভাপতি বানিয়ে মাদরাসা বোর্ড থেকে গোপনে পাস করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৮ সালের ৩০ জুন আমিনুল ইসলাম তার স্বাক্ষরিত মাদরাসার প্যাডে লিখিতভাবে ইস্তফা দেন। এছাড়াও একটি ১৫০ টাকার স্ট্যাম্পে ১২ জন শিক্ষকের নিকট থেকে চাকরি দেয়া এবং প্রতিষ্ঠান করার লক্ষ্যে ৩২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা নেয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়।

সারা বাংলাদেশে সরকার তিনটি মাদরাসাকে জাতীয়করণের নতুন ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে কুড়িগ্রামে সাবেক ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার শেখ ফজিলাতুন্নেসা দাখিল মাদরাসাটি অন্তর্ভুক্ত হয়। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি জাতীয়করণের ঘোষণার পর আমিনুল ইসলাম তার আগের মাদরাসা থেকে ইস্তফা না দিয়েই কিছু প্রভাবশালী আর শিক্ষা বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে ১৭ জানুয়ারি পুনরায় সুপারের দায়িত্ব নেন। এতে একই ব্যক্তি দুটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পাওয়ায় অন্যান্য শিক্ষকসহ ছিটমহলবাসীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এই বিষয়ে মাদরাসার শিক্ষক আমজাদ হোসেন, এরশাদুল হক, আবু বকর সিদ্দিক, আঞ্জুয়ারা বেগমসহ অনেকেই জানান, আমিনুল ইসলামকে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পর চাকরির জন্য বিভিন্ন অংকের টাকা দেয়া হয়েছে। এরপর তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠলে তিনি মাদরাসা থেকে অব্যাহতি দিয়ে পূর্বের মাদরাসায় চলে যান। এখন পর্যন্ত তিনি টাকা ফেরত দেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেক শিক্ষক বলেন, আমিনুল ইসলামকে পুনরায় সুপারের পদে বসানোর পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক একটি দলের মদদ এবং শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জড়িত। এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসে অভিযোগ দিতে গেলে শিক্ষা অফিসার অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানান।

শেখ ফজিলাতুন্নেসা দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা মো. শাহনুর আলম বলেন, আমিনুল ইসলামের অব্যাহতির পর আমাকে সুপারের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু মাদরাসাটি জাতীয়করণ ঘোষণার পর জানুয়ারি মাসে জোরপূর্বক তিনি সুপারের চেয়ারে বসে মাদরাসার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছেন।

এ বিষয়ে মধ্যকাশিপুর দ্বি-মুখী দাখিল মাদরাসায় তথ্য সংগ্রহের সময় প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও আমিনুল ইসলামের আত্মীয় কাশিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মানিকসহ কয়েকজন শিক্ষক সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হন। এ সময় তারা আমিনুল ইসলাম সম্পর্কে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে জানা যায়, আমিনুল ইসলাম এখনো অত্র মাদরাসার চাকরি ছাড়েননি। তিনি নিয়মিত তার নামে বিল উত্তোলন করছেন।

চাকরিরত অবস্থায় আরেকটি মাদরাসার সুপারের দায়িত্ব কীভাবে নিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত একটি নিষেধাজ্ঞা চিঠি পেয়েছি। তাই এই বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারবো না।

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসার শামছুল আলম বলেন, আমার কাছে লিখিত কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে বিধি মোতবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেন, এমন একটি অভিযোগ এসেছে। তদন্ত সাপেক্ষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

নাজমুল হোসাইন/আরএআর/এমকেএইচ