হাসপাতাল গড়ার গল্প শোনালেন ফুলেআরা
চারদিকে যমুনার থৈ থৈ পানি। কল কল পানির শব্দ। চোখ তুললেই সামনে ধু ধু প্রান্তর। সন্ধ্যা নামলেই যে গ্রামে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার সেই গ্রামটির নাম জোড়গাছা। এটি যমুনা নদীর চর। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার নাটুয়াপাড়া চরে এর অবস্থান।
মাছ ধরেই এই চরের মানুষ বেঁচে থাকেন। এখানে নেই কোনো চিকিৎসা, নেই তেমন কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা। সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকটিও জেগে থাকে দিনের আলোয়। রাতে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে অপেক্ষা করতে হয় সকালের জন্য। তারপর নৌকায় দেড়-দুই ঘণ্টা পাড়ি দিলে মেলে চিকিৎসকের দেখা। ততক্ষণে হয়তো থেমে যায় রোগীর হৃস্পন্দন।
এই ‘জোড়গাছা’ গ্রামেই বাস ছিল কিশোরী ফুলেআরার। এগারো বছর বয়সী ফুলেআরার চোখের সামনে তিন বছরের ছোট্ট ভাই সুজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সেবার ভীষণ ঠান্ডা লেগেছিল সুজনের। বুক ওঠানামা করছিল, নিঃশ্বাস নিতে বড় কষ্ট হচ্ছিল ওর। চরের কবিরাজ দেখিয়ে কোনো কিছুই হলো না তার। অবস্থা ধীরে ধীরে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। দিনের আলো পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে চারদিকে। ওকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হবে। ছুটল তারা ঘাটে কিন্তু কোথাও কোনো নৌকা নেই। মনমরা হয়ে বাড়ি ফিরে এলো। সে রাতেই নিভে গেল সুজনের জীবন প্রদীপ। কোলেপিঠে করে আদরে বড় করা ছোট ভাইকে হারিয়ে ফেলে ফুলেআরা। ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৮২ সালে।
ভাই হারানোর শোক বুকে চেপে ফুলেআরা ভাবতে থাকেন এভাবেই কি এই চরের মানুষকে মরতে হবে? বোন তার ভাইকে হারাবে, বাবা মা তার সন্তানকে? রাক্ষুসী যমুনার দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে মৃত্যু ভয় জয় করার।

ছোট ভাই হারানোর এক বছরের মাথায় বিয়ে হয়ে যায় ফুলেআরার। স্বামী তার তখনও ছাত্র। এইচএসসি পাস করে সিরাজগঞ্জে ডিএমএফ (ডিপ্লোমা অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) কোর্সে ভর্তি হন। তিন বছরের লেখাপড়া শেষ করে দু’বছর বেকার জীবন কাটাতে হয় স্বামী ইমাম হোসেনকে। অভাব অনাটনের সংসার পার করতে হয় ফুলেআরার। তবুও স্বপ্ন দেখা থেমে থাকেনি।
স্বামী ইমাম হোসেন বেকার জীবন কাটিয়ে ১৯৮৬ যোগ দেন উপসহকারী মেডিকেল অফিসার হিসেবে। বেকার স্বামীর চাকরি পাওয়ার পর দানা বাঁধতে থাকে স্বপ্নটা। ১৯৯০ সালে নিজের ইচ্ছা ও স্বপ্নের কথা খুলে বলেন স্বামীকে। ইমাম হোসেন সব শুনে খুশি হন। কিন্তু তাদের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় অভাব। তারপরও থেমে থাকেননি ফুলেআরা।
স্বামীকে বলেন, সংসারে একজন কাজের লোক রাখলেও তো তার খরচ দিতে হতো। সেই খরচ বাঁচাবেন তিনি। তার সংসারে কোনো কাজের লোক রাখবেন না। ঠিক করে নিলেন দামি শাড়ি বা অলংকার আর পরবেন না তিনি। এমনকি দামি খাবার-দাবারও মুখে তুলবেন না। কাজের লোকের বেতন বাবদ মাসিক পাঁচশ টাকা করে স্বামীর কাছ থেকে নিয়ে জমাতে থাকেন। তিলতিল করে জমতে থাকে অর্থ। টাকার বাক্সটার ওজন দিনে দিনে বাড়তে থাকে।
অবশেষে ২০০৫ সালে ফুলেআরা তার স্বপ্নের সঞ্চয় এক লাখ টাকা তুলে দেন স্বামীর হাতে। বালুর চরের বুকে জন্ম নেয় আশার আলো। নিভুনিভু করে জ্বলতে থাকে বাজারের কাছে তার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকেন্দ্র। যেহেতু গ্রামের মানুষের হোমিওপ্যাথির উপর বেশি ঝোঁক ছিল। এই জন্য হোমিওপ্যাথি দিয়েই যাত্রা শুরু করেন তিনি। চলতে থাকে মানব সেবা। গরিব অসহায় মানুষ চিকিৎসা নিতে থাকেন। কিন্তু আবার যমুনার জলে ভেসে যায় তার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকেন্দ্রটি। কিন্তু থামেননি ফুলেআরা। আবার জলের বুক ফুড়ে চর জাগে। আবার ঘর ওঠে। শুরু হয় আরেক জীবন। আবার সংগ্রাম, বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ।
শুরু হয় আবার টাকা জমানো। কিছু জমানো টাকা স্বামীর হাতে আবার তুলে দেন ফুলেআরা। আবার হাসপাতাল গড়তে থাকেন। এবার স্বামী বিত্তবান লোকের কাছে ছুটে যান তার প্রিয়তমার আশা পূরোণের জন্য। কিন্তু তেমন কোনো সাহায্য আসে না। খালি হাতে হাসপাতাল তৈরি করাকে ‘পাগলের প্রলাপ’ বলেই আখ্যায়িত করে সবাই। কিন্তু থেমে থাকেনি কাজ। এক সময় তাদের ডাকে সাড়া দেন খেটে খাওয়া মানুষ। কেউ দেন একটি টিন, কেউ দেন কাঠ-বাঁশ, কেউ দেন এক কেজি পেরেক, যার কিছু নেই তার একবেলার শ্রম নিয়ে এলাকাবাসী পাশে দাঁড়ান ইমাম হোসেন ও ফুলেআরার।
সবমিলিয়ে ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো দাঁড়িয়ে যায় ফুলেআরার স্বপ্ন- ‘আমিনা দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতাল’। এক দশক আগে গড়া প্রত্যন্ত চরের গৃহিণী ফুলেআরার সেই মানবসেবা হাসপাতাল এখনো যমুনা নদীবেষ্টিত পাঁচটি ইউনিয়নের হাজারো অসুস্থ মানুষের ঠিকানা। ফুলেআরা তার শাশুড়ি ও শ্বশুরের নামে রেখেছেন হাসপাতালের নাম। সেই থেকে যমুনার দুর্গম চরাঞ্চলের নাটুয়ারপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ, মনসুরনগর ও তেকানী ইউনিয়নসহ চরাঞ্চলের প্রায় ২ লাখ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছে হাসপাতালটি। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। সচ্ছল ব্যক্তিদের কাছ থেকে নামমাত্র ফি নেয়া হলেও দরিদ্র-হতদরিদ্রদের জন্য তা বিনামূল্যে। দেওয়া হয় স্বল্পমূল্যে জরুরি ওষুধ। সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দেন হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ফুলেআরার স্বামী ইমাম হোসেন।
ফুলেআরার ছোট বোন রেনুকা খাতুন। তিনিও এই হাসপাতালের সার্বক্ষণিক চিকিৎসক। পল্লী চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখানে রোগী দেখেন। প্রাথমিক সেবা দেন।

ফুলেআরার সেদিনের স্বপ্নের হাসপাতাল আজ আনেক দূর এগিয়ে গেছে। সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের জন্য আছে সোলার প্যানেল। তার পাশেই রয়েছে ফার্মেসি। জরুরি রোগী আনা নেয়ার জন্য হয়েছে স্পিডবোট। রোগীর সেবার সরঞ্জামও বাড়ছে দিনে দিনে। এই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা সবার জন্য ফ্রি। তবে সচ্ছল ব্যক্তিরা ইচ্ছে করলে ওষুধ কিনতে পারেন। আর দরিদ্র ব্যক্তির জন্য ওষুধও ফ্রি।
ফুলেআরা তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পেয়েছেন মানুষের ভালোবাসা। পেয়েছেন সম্মাননা, সহযোগিতা। পেয়েছেন ‘সিঙ্গার-চ্যানেল আই কিংবদন্তি’ পুরস্কার। ২০১৪ সালের কীর্তিমতী হিতৈষী হিসেবে ‘রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননা’ও এসেছে তার হাতে।
এ বিষয়ে ফুলেআরার স্বামী আলহাজ্ব ডা. ইমাম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, হাসপাতালটি চালাতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। মানুষের কাছ থেকে নানাভাবে সহায়তা পাচ্ছি, কিন্তু তা দিয়ে ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে একটি জেনারেটর ও অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি ইজিবাইক বা এ জাতীয় গাড়ি দরকার। কিন্তু কত দিনে সম্ভব হবে বুঝতে পারছি না। তবে আধুনিক একটি হাসপাতাল করতে আমৃত্যু চেষ্টা করে যাব।
এ বিষয়ে আমিনা দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ফুলেআরা ইমাম জাগো নিউজকে বলেন, কোলেপিঠে করে বড় করা ছোট ভাই সুজন যখন বিনা চিকিৎসায় মারা গেলো ঠিক তখন থেকেই ভাবতাম চরাঞ্চলের মানুষের জন্য কিছু করার।
তবে স্বপ্নবান ফুলেআরা স্বপ্ন দেখেন। তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি আরও বড় হবে। চরের অসুস্থ মানুষের কাছে হয়ে থাকবে আশার আশ্রয়।
এফএ/পিআর