শ্রমিক সংকটে পাবনার চলন বিলাঞ্চলে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ১০:২২ পিএম, ২৯ মে ২০২০

শস্যভাণ্ডার খ্যাত পাবনার চলনবিল অঞ্চলে এবার ইরি-বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। দিগন্ত জোড়া বিলে পাকা ধানের সোনালী শীষে দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন।

কিন্তু উঠতি বোরো ধান নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা ও শঙ্কায় পড়েছেন কৃষক। তাদের সেই স্বপ্ন তলিয়ে গেছে বড়াল ও গুমানী নদীসহ বেশ কয়েকটি শাখা নদীর জোয়ারের ও বৃষ্টির পানিতে।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে কয়েকদিনের বৃষ্টির পর জোয়ারের পানি নদী দিয়ে ঢুকে পড়েছে বিলে। এতে চাটমোহর উপজেলার খলিশাগাড়ী বিল, আফরার বিলসহ নলডাঙ্গা, ছাইকোলা, হান্ডিয়াল, বোঁথরসহ বিভিন্ন এলাকার বিলের ধান তলিয়ে গেছে।ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলারও বিস্তির্ণ অঞ্চলের ধানের সাথে তলিয়ে গেছে কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন।

তলিয়ে যাওয়া ধান নিয়ে কৃষক পড়েছেন বিপাকে।অনেকেই আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু করোনার প্রভাবে কৃষি শ্রমিকের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।ইতোমধ্যে চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়াসহ চলনবিল অঞ্চলে ৩০ ভাগ জমির বোরো ধান কেটে ঘরে তুলেছেন কৃষক। বাকি ৭০ ভাগ ধান নিয়ে চরম শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন তারা।

আকাশে মেঘ আর বৃষ্টিপাত থেমে থেমে হচ্ছে। এরই মধ্যে জোয়ারের পানি বড়াল ও গুমানী নদী ভরে বিলে ঢুকে পাকা বোরো ধানের জমি তলিয়ে দিয়েছে। এরআগে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে একদফা বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। এবার পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ধানের জমি।করোনার প্রভাবে কৃষি শ্রমিক মিলছে না। যাও পাওয়া যাচ্ছে, তাদের দিতে হচ্ছে চড়া মজুরি। ৭০০ টাকা মজুরি দিয়েও কামলা পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি শ্রমিক সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষক।
এমতাবস্থায় ঝড়, শিলাবৃষ্টি আর পানি বাড়ার আশঙ্কা নিয়ে চরম দৃশ্চিন্তায় পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-রিচালক আজাহার আলী জানান, এবার পাবনায় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২ লক্ষ ৫০ হাজার মেট্টিক টন।

Chatmohar-Dhan-Kata

তিনি বলেন, পাবনায় বোরো কাটা হচ্ছে অন্য জেলার তুলনায় দেরিতে। ঈদের দু’দিন আগে থেকে পাবনা সদর থেকে ধান কাটা শুরু হয়। পুরো জেলায় ২০ দিন ধরে ধানকাটা চলবে। এরই মধ্যে কিছু কিছু এলাকায় ঝর বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটা বিঘ্নিত হচ্ছে।

চাটমোহর উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার চাটমোহরে ৯ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের বাম্পার ফলনে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু হঠাৎ নদীর পানি বৃদ্ধিতে বিলের ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

হান্ডিয়ালের কৃষক জাকির হোসেন বললেন, এখনও পুরোপুরি ধান পাকেনি। তবে ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধানের ফলনও ভালো। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি ধানের ক্ষতি করেছে। আকাশে মেঘ, রোদ মিলছে না। কামলা (কৃষি শ্রমিক) না পেয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। কী হবে আল্লাহই জানেন।’

বোয়ালমারী গ্রামের কৃষক আঃ মতিন কললেন, হঠাৎ করেই গুমানী নদীতে জোয়ারের পানি বেড়ে গেছে। নদীর পানি এখন বিলে ঢুকছে। উপজেলার খলিসা গাড়ী বিলের অনেক ধানের জমিই এখন পানির নিচে। কিনু সরকারের জোলার স্লুইস গেট বন্ধ করে না দিলে সব ধানই ডুবে যাবে।

আরেক কৃষক আ. মমিন বলেন, তাড়াহুড়া করে ধান কাটতে হচ্ছে। কিন্তু কামলা মিলছে না। করোনাভাইরাসের কারণে অনেকেই আর ধান কাটতে আসছে না। নিজেরাই যতদূর সম্ভব ধান কাটছি। কিন্তু ঝড়, বৃষ্টি আর পানি বাড়ার কারণে ধানের বেশ ক্ষতি হবে।

ছাইকোলা গ্রামের কৃষক সিদ্দিক আলী জানান, আবাদকৃত ধান নিয়ে তারা বিপদে আছেন।কিভাবে ধান ঘরে তোলা হবে সেই চিন্তা সবার মধ্যে।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রবিউল করিম জানান, চাটমোহরে এবার হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাতের বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এবার ধানের ফলনও বাম্পার। ইতোমধ্যে ৩০ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।বর্ষণ ও পানিতে ২০ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

কৃষকরা জানান, খলিশাগাড়ী বিল, নলডাঙ্গা, ছাইকোলাসহ বিভিন্ন বিলের অন্তত ২শ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

কৃষি কর্মকর্তা এ এ মাসুম বিল্লাহ জানান, হঠাৎ জোয়ারের পানি বেড়ে গিয়ে বিলে পানি ঢুকেছে। গত বুধবার (২৭ মে) পর্যন্ত জোয়ারের পানি আর বৃষ্টির কারণে ২০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে রোদ হলে বেশি ক্ষতি হবে না।

তিনি জানান, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে চাটমোহর উপজেলায় ১৪৬ হেক্টর জমির ফসল ও আম-লিচুর ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বললেন, উপজেলার কিনু সরকারের জোলা দিয়ে নদী থেকে বিলে পানি ঢুকছে। এখানকার স্লুইজ গেট বন্ধ করার জন্য আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেছি।

চাটমোচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার মোহাম্মদ রায়হান জানান, ফসলের ক্ষতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিনু সরকারের জোলার স্লুইস গেটটি বন্ধ করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। সেটা বন্ধ করে দেয়ার কথা। এতে বিলের ধান রক্ষা পাবে।

একে জামান/এমএএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]