ভোটার হওয়ার বয়সই হয়নি অথচ এনআইডি দিয়ে সরকারি চাল উত্তোলন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৫:০৫ পিএম, ০৭ জুন ২০২০
ফাইল ছবি

হবিগঞ্জে এবার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি চালের তালিকায় অনিয়মের তথ্য মিলেছে। তালিকায় একাধিক ব্যক্তির নামের পাশে একই জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (এনআইডি) বসিয়ে দেয়া হয়েছে।

আবার রয়েছে অসংখ্য ভুয়া এনআইডি নম্বরও। কোথাও আবার প্রকৃত এনআইডি নম্বর একজনের নামে আর তালিকায় রয়েছে অন্যজনের নাম। ২০০৩, ২০০৫ এবং ২০০৭ সালে যাদের জন্ম তাদেরও ভোটার দেখিয়ে ভুয়া নম্বর বসিয়ে সরকারি চাল দেয়া হচ্ছে। অথচ ভোটার হওয়ার বয়সই হয়নি তাদের।

এ নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই সাধারণ মানুষের মধ্যে। এর আগে প্রধামন্ত্রীর অর্থ সহায়তা তালিকায়ও গলদের সত্যতা পান জেলা প্রশাসক। এরই প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মলাই মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

লাখাই উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ মুক্তার হোসেন বেনু বলেন, মেম্বাররা যে তালিকা দিয়েছেন সে তালিকার ভোটার আইডি নম্বরগুলো মিলিয়ে দেখা হয়নি। তবে এইটুকু দেখা হয়েছে যাদের নাম দেয়া হয়েছে তারা পাওয়ার যোগ্য কি-না। যারা পাওয়ার যোগ্য তাদের নামই তালিকায় দেয়া হয়েছে।

বামৈ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনামুল হক মামুন বলেন, এমনটি হওয়ার কথা নয়। তবে ভুল হতেই পারে। তালিকা ডিলারদের কাছেও আছে, আমাদের অফিসেও আছে। আমি মিলিয়ে দেখব।

লাখাই ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আইয়ুব রেজা ইমরান বলেন, আমার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরিফ আহমেদ রুপন হত্যা ও সরকারি চাল আত্মসাতের মামলায় দুই বছর ধরে কারাগারে। এরপর থেকে আমি দায়িত্বপালন করছি।

তালিকায় ভুল এবং চাল উত্তোলন করার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি হওয়ার কথা নয়। এরকম কেন হলো তা আমার দেখার আছে। আমি এটি অবশ্যই দেখব।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আব্দুস ছালাম বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ছাড়া কারও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড পাওয়ার সুযোগ নেই।

ভুয়া এনআইডি নম্বরের বিষয়ে তিনি বলেন, তালিকা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যানরা। তারা যাচাই-বাছাই করে দেয়ার পর আমরা কার্ড ইস্যু করি। ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে যে কার্ডগুলো নেয়া হলো তার চালগুলো কে তুলছে। বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। ইতোমধ্যে যাচাই-বাছাই শুরু করেছি।

তিনি বলেন, প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন দ্রুত বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেন। কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জেল- জরিমানা করা হচ্ছে। কাউকে এ বিষয়ে ছাড় দেয়া হবে না।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাদিকুল ইসলাম বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর চার স্তরের হয়। স্মার্টকার্ড ১০ ডিজিট হয় এবং ৩৬ দিয়ে শুরু হয়। ২০০৮ সালে তৈরিকৃত নম্বর ১৩ ডিজিট, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে তৈরিকৃত নম্বর ১৭ ডিজিট হয়। কারণ এগুলোর সামনে জন্মসাল উল্লেখ থাকায় তা ১৭ ডিজিট হয়। এছাড়া আরেকটি থাকে ভোটার নম্বর ১২ ডিজিট। এর বাইরে কোনো ডিজিট থাকলে ধরে নিতে হবে তা ভুয়া।

তিনি বলেন, ২০০২ সালে যাদের জন্ম এ বছর তারা ভোটার হয়েছেন। কিন্তু তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হয়নি এখনও। পরবর্তী সালে যাদের জন্ম তাদের এখনও ভোটার হওয়ার সুযোগ নেই। এতগুলো ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি ব্যবহার করে সরকারি সুবিধা কারা নিচ্ছে?

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, লাখাই উপজেলার বামৈ ইউনিয়নের তালিকায় ২১৯ নম্বরে শাহানুর মিয়া ও ২৫৭ নম্বরে বিউটি সরকারের জন্ম সাল দেখানো হয়েছে ২০০৬। ২৬৩ নম্বরে এলাহিন মিয়া ও ২৬৫ নম্বরে ফয়ছল মিয়ার জন্ম সাল দেখানো হয়েছে ২০০৫ এবং ২৬৬ নম্বরে জেরিনা আক্তারের জন্ম সাল দেখানো হয়েছে ২০০৭ সাল। তাদের প্রত্যেকের নামের পাশে জন্ম সাল দিয়ে এনআইডি নম্বর বসানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভোটার হওয়ার বয়স হয়নি তাদের। এমনকি তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রও পাওয়ার সুযোগ নেই। এই তালিকায় অসংখ্য ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করা হয়েছে।

একই উপজেলার লাখাই ইউনিয়নেও একাধিক নামের পাশে একই এনআইডি নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। তালিকার ১৭ নম্বরে সমির চক্রবর্তীর নামের পাশে (১৯৮৯৩৬১৬৮৫৪০০০০০০) এনআইডি নম্বর বসানো হয়েছে। যা তালিকার ৭১ নম্বরের সামছু মিয়া এবং ৭২ নম্বরের রনু সরকারের নামের পাশেও বসানো হয়েছে।

এছাড়া তালিকার ১০ নম্বরের মানিক দাস ও ৭৪ নম্বরের রোজিনা বেগমের নামের পাশে একই নম্বর বসানো হয়েছে। একইভাবে ১০ জনের নামের পাশে একই এনআইডি নম্বর একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে। যার একটিও সঠিক নয়।

বুল্লা ও মুড়িয়াউক ইউনিয়নেও একই অবস্থা। ওই তালিকাগুলোতেও অসংখ্য ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির হালনাগাদ তালিকা-২০২০ সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাই করা হয়। তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে এসব ভুয়া পরিচয়পত্রের তথ্য পাওয়া যায়।

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এএম/এমকেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।