ট্রলারডুবিতে আপনজন হারিয়ে ৩ পরিবারে শোকের মাতম
ফরিদপুরে দিনমজুরের কাজ করতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে নিহত হয়েছেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের ৩ দিনমজুর। সাঁতরে জীবন নিয়ে ফিরেছেন একই গ্রামের আরও ৩ দিনমজুর। নিহত দিনমজুরদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েছে তিনটি পরিবার।
সরেজমিনে হোসেনপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, নিহত শাহাবুল হকের দেড় বছরের মেয়ে মা ও দাদা-দাদির মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে। অবুঝ শিশুটি এখনও বুঝতে শেখেনি কী মূল্যবান সম্পদ সে চিরদিনের জন্য হারিয়েছে। শাহাবুল হকের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে।
নিহত যুবক শিলনের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। তিনি মাঝে মধ্যেই মূর্ছা যাচ্ছেন। নিজের ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের শঙ্কায় ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন তিনি। কাদঁছেন শিলনের মা-বাবা ও ভাইবোনও।
একইভাবে বিলাপ করতে দেখা গেছে নিহত দিনমজুর আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী ও মা-বাবাকে।
নিহত ৩ দিনমজুরের পরিবারে শুধু তারাই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। ফলে অভাবের সংসারে অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্কের ছায়া ছিল সবার চোখে মুখে।
সাঁতরে জীবন নিয়ে ফেরা দিনমজুর একরামুল হকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলমডাঙ্গা উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের ৬ দিনমজুর গত ৩১ মে কাজের সন্ধানে ফরিদপুরে যান। তারা ফরিদপুর বাইপাস সড়কের আদমহাটে উপস্থিত হন। সেখানে ফরিদপুর সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর খারকান্দি গ্রামের লালন ফকির নামের এক ব্যক্তি তাদেরকে দৈনিক ৬শ টাকা মুজুরি হিসেবে বাদাম তুলতে শ্রমিক নিয়োগ করেন। লালন ফকিরের জমি পদ্মা নদীর ওপারে অবস্থিত। প্রতিদিন ছোট ট্রলারে করে লালন ফকিরের ছেলে শাকিল ফকির শ্রমিকদের পদ্মার ওপারে বাদাম ক্ষেতে নিয়ে যাওয়া আসা করতেন।

গত ৫ মে মোট ২৭ জন দিনমজুর ট্রলারে তুলে নিয়ে শাকিল ফকির পদ্মার ওপারে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ছোট ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী তোলায় নদীর মাঝামাঝি শয়তানখালির ঘাট বরাবর ট্রলারটি পানিতে ডুবে যায়। কিছুক্ষণের ব্যবধানে ঘটনাস্থলে আরেকটি ট্রলার উপস্থিত হলে অনেকে সাঁতরে সেই ট্রলারে উঠে জীবন বাঁচান। কিন্তু তীব্র স্রোতে পানিতে ডুবে যান হোসেনপুরের ৩ জনসহ ৫ দিনমজুর।
পানিতে ডুবে নিহত হোসেনপুরের এ তিন দিনমজুর হলেন, নূরুল হকের ছেলে শাহাবুল হক (৩২), আয়নাল হকের ছেলে শিলন (২৫) ও তারাচাঁদ মন্ডলের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক (৫০)।
এছাড়া জীবন বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরেছেন একই গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে একরামুল হক (৩৮), হানেফ মন্ডলের ছেলে মোমেন হক (২৫) ও লস্কর মন্ডলের ছেলে আমজেদ আলী (৩৫)। স্রোতের তোড়ে হারিয়ে যাওয়া ৩ দিনমজুরের লাশের হদিস এখনও পাওয়া যায়নি। সে কারণে গতকাল মঙ্গলবার গ্রামবাসী ৩ দিনমজুরের গায়েবানা জানাজাও করেছেন।
এদিকে যার ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুর জেলার সেই লালন ফকির নিহতদের কোনো আর্থিক সহযোগিতা করেননি বলে নিহতদের পরিবার জানিয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী ট্রলারে ওঠানোর ফলে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটলেও ট্রলারের মালিক ও চালক শাকিল ফকির কোনো দায় নেননি।
তবে ফরিদপুর জেলার চর নাসিরপুর ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য রিপন ফকির মুঠেফোনে জানান, ট্রলারডুবির সংবাদ পেয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। সে সময় পুলিশ লালন ফকিরকে আটক করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।
অপরদিকে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন আলী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাধ্যমত আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সালাউদ্দীন কাজল/এফএ/জেআইএম