২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ইতিকথা

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৪০ পিএম, ০৬ জুলাই ২০২০

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল নিয়ে দীর্ঘদিন পক্ষে-বিপক্ষে টানা হ্যাঁচড়া চলছে। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজও চালু হয়নি চিকিৎসা সেবা। অনেক তদবিরের পরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি।

হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা জগদল গ্রামের কৃতি সন্তান মিজানুর রহমান ৬ আগস্ট তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘২০ শয্যার এই হাসপাতালটি কীভাবে প্রতিষ্ঠা করলাম, কেনই বা চালু হচ্ছে না। কীভাবে চালু করা যাবে সে বিষয়ে দিরাই-শাল্লাসহ সুনামগঞ্জের অনেকেই আমার কাছে জানতে চান’।

তাদের কৌতূহল নিবারণের জন্য ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, যুক্তরাজ্য থেকে লেখাপড়া শেষ করে ২০০৩ সলের জুলাই মাসে দেশে ফিরে উপ-সচিব হিসাবে মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন’।

‘এলাকার প্রতি তার দরদ গ্রামের মানুষজন জানতেন। তাদের ধারণা হলো এবার মিজানুর রহমান তার গ্রামের উন্নয়নে কাজ করতে পারবেন। কোনো একদিন মিজানুর রহমানের কাছে গেলেন গ্রামের শ্রদ্ধাভাজন চাচা আব্দুল মতিন ও আব্দুল ওয়াদুদ মানিক (প্রয়াত) এবং বদরুল হুসেন। তারা গ্রামে গিয়ে মানুষের কথা শুনতে আমন্ত্রণ জানালেন’।

মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি যাচ্ছি এবং দিরাই থেকে জগদল পর্যন্ত সকল গ্রামের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলাম। আর তাদের দাবি দাওয়ার সাথে পরিচিত হলাম। অবশ্য দাবিগুলির কিছু আমি এলাকার সন্তান হিসাবে আগে থেকেই জানতাম’।

jagonews24

‘দাবী অনুযায়ী আমি একে একে আমার প্রতিশ্রুত জগদল গ্রামের ভেতরের প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, জগদল আল ফারুক উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত দুটি ভবন নির্মাণ, ৩ তলা জগদল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ, শিরকুপায় দ্বিতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ, রাজনগর (হালায়া) গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ, বাশুরি গ্রাম বিদ্যুতায়ন, জগদলে তহসিল অফিস ভবন নির্মাণ এবং টুকচানপুর থেকে করিমপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পাকা সড়ক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করি’।

কৃষি ব্যাংকের একটি শাখা জগদলে প্রতিষ্ঠা করেও অদৃশ্য কারণে তা রাখতে পারিনি। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক হাতিয়া গ্রামের বিদ্যুতায়নের অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ করলেও সরকার পরিবর্তনের কারণে কাজটি সমাপ্ত করতে পারিনি। করিমপুর থেকে মাটিয়াপুর গ্রামের পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত অনুমোদিত প্রকল্পের ১ কিলোমিটার শেষ করার পর আর অগ্রসর হয়নি এবং সরকার পরিবর্তনে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।

একইভাবে দিরাই বালিকা বিদ্যালয় থেকে কালনি নদীর উপর একটি ব্রিজ আমি অনুমোদন করিয়েছিলাম যার টেন্ডার ও হয়েছিল কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। এভাবে একের পর এক উন্নয়ন কাজ যখন করে যাচ্ছিলাম, এলাকাবাসীর দাবি ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। ক্রমবর্ধমান আকাঙ্খার প্রতিফলন হিসেবে একদিন আমার প্রয়াত চাচা আব্দুল ওয়াদুদ মানিক এবং ভাই বদরুল হুসেন আমার কাছে আরও দুটি দাবি উথাপন করলেন; এর একটি হল জগদলে থানা প্রতিষ্ঠা আর অপরটি জগদলে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা। থানার বিষয়ে আমি নীতিগতভাবে একমত ছিলাম না কিন্তু হাসপাতালের দাবি শুনে আমার মন কাতর হয়ে পড়ে।

মনে পড়ে যায় আমার মা ও বাবার প্রায় বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুর দুর্বিসহ স্মৃতি। মা ও বাবার চেয়ে আপনজন দুনিয়াতে আর কেউ নাই। আমার মা ডায়াবেটিকসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। প্রায়শঃই মাকে নিয়ে দিরাই ডাক্তারের কাছে যেতে হত। মনে পড়ে কার্তিক মাসে ঝাঁপি (পলো) এর মধ্যে খড় বিছিয়ে মাকে দিরাই হাসপাতালে নিতে হত। কারণ এই সময় নৌকা চলত না হাঁটাই ছিল একমাত্র যোগাযোগ। পলো-এর ঝাঁকুনিতে মা মাঝে মাঝে চিৎকার করে কাঁদতেন আমিও কাঁদতাম। ১৯৮৫ সনে মাকে যখন সিলেট নিয়ে যাই তখন মা ছিলেন সব চিকিৎসার ঊর্ধে। আমরা মাকে হারাই। এখন ও মায়ের সেসব স্মৃতি মনে হলে কান্না থামতে চায় না। হাসপাতাল না থাকা এবং যোগাযোগ সমস্যার কারণে প্রায় একইভাবে ২০০৬ সালে বাবাকে ও হারাতে হয়।

হাসপাতালের প্রস্তাব আসাতে মনে হলো এইতো সুযোগ কাজ করার। আমার মা-বাবার মতো সকল মা বাবাই সন্তানের কাছে অমূল্য সম্পদ। আমার মা বাবা বেঁচে নেই কিন্তু একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হলে অসংখ্য মা-বাবা চিকিৎসা পাবেন এবং তাদের মধ্যে আমি আমার মা-বাবা হারানোর বেদনা কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে পারব।

সৌভাগ্যক্রমে এ সময় আমি কুমিল্লা জেলার জেলা প্রশাসক ছিলাম এবং তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হুসেন ছিলেন কুমিল্লা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। কুমিল্ল জেলাকে শতভাগ স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এর আওতায় আনয়ণ, শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং শহরের সৌন্দয্য বর্ধনের কারণে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করায় মন্ত্রী আমাকে যথেষ্ট পছন্দ করতেন। কয়েকবার কুমিল্লা সফরে এসে আমার কাজকর্মে সন্তুষ্ট ছিলেন ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী।

এরই মধ্যে জানতে পারি সরকার ২০ শয্যা বিশিষ্ট ২০টি হাসপাতাল নির্মাণ করার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আমি বিলম্ব না করে মন্ত্রীর কাছে দাবি জানালাম ২০টির মধ্যে আমার গ্রামে যেন একটি থাকে। তিনি কথা দিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০টি হাসপাতালের তালিকায় ৫ নম্বরে জগদলের স্থান হলো। এরপর টেন্ডার হলো এবং কার্যাদেশ ও হলো। মন্ত্রীর অনুরোধে হুইপ ফজলুল হক আসপিয়া ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন।

উল্লেখ্য, ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে এমপি সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমি নিজে গিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে এই প্রকল্পে সরকারি অর্থ বরাদ্দ প্রত্যাহার করে নিয়ে প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংককে অনুরোধ করে। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে অর্থায়ন করতে নীতিগতভাবে রাজি হয় এবং দখল প্রক্রিয়া ছাড়া জমি দানপূর্বক প্রকল্পটিতে জমির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে অনুরোধ করে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় ৩ একর জমি প্রাপ্তি সম্ভব না হওয়ায় ২০টির মধ্যে অনেকগুলি প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিচ্ছে মর্মে আমি অবগত হই। আমি দ্রুত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টরের সাথে দেখা করি ও আমার গ্রামে হাসপাতাল স্থাপনের যৌক্তিকতা তাকে ব্যাখ্যা করি। আমার মা বাবার করুণ মৃত্যুর বৃত্তান্ত তার কাছে উপস্থাপন করলে তিনি ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তখন নির্ধারিত সময় প্রায় শেষ।

আমাকে তিনদিনের সময় দিয়ে ৩ দিনের মধ্যে ৩ একর জমির দলিল তার নিকট প্রদানের জন্য অনুরোধ করলেন এবং বলে দিলেন জমির দলিল যথাসময়ে দিতে পারলে জগদল হাসপাতাল হবে। আমি বিলম্ব না করে গ্রামের সংশ্লিষ্ট সকলকে দ্রুত দিরাই গিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দলিল আমার কাছে ২ দিনের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য তাগাদা দিই। একই সাথে আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে রেজিস্ট্রেশন খরচ ৫২ হাজার টাকা মওকুফ করিয়ে নিই।

সাব-রেজিস্ট্রারকে অনুরোধ করি তিনি যেন ওইদিনই জমি রেজিস্ট্রি এবং দলিলের নকল সরবরাহ করেন। জমিদাতারা সকলে দিরাই আসেন এবং জমি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেন ও দলিলের নকল সংগ্রহ করে দুইজন রাতের বাসে ঢাকা রওয়ানা হন। নির্ধারিত শেষদিনে সকালে আমাকে দলিল দেয়া হলে আমি বেলা ১১টায় দেখা করে কান্ট্রি ডিরেক্টরের হাতে দলিল অর্পণ করি। এরপর আবার টেন্ডার ও কার্যাদেশসহ নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়।

ঠিকাদারকে বলে দিই এই প্রকল্পে কোনো প্রকার দুর্নীতি এবং কাজে গাফিলতি করা যাবে না এবং কাজে আমার জানামতে কোনো দুর্নীতি বা গাফিলতি হয়নি বিধায় জগদলে একটি দৃষ্টিনন্দন হাসপাতাল জগদলের সকলের সহযোগিতায় আমি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি যার তুলনা সিলেট বিভাগে বিরল।

jagonews24

হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরপরই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পুনরায় এমপি নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হয়ে হাসপাতালটি উদ্বোধন করার ইচ্ছা জানালে আমি তাকে বলি জনবল ও সরঞ্জাম কাঠামো অনুমোদন করিয়ে এবং ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিয়ে তবেই উদ্বোধন করুন, আমাকে তাতে না রাখলেও আমি সহযোগিতা করব।

তিনি আমার কথা না শুনে ঘটা করে এসে উদ্বোধন করলেন এবং বলে গেলেন ৬ মাসের মধ্যে সব হবে। ৬ মাস পেরিয়ে ৬ বছর চলছে কিন্তু হাসপাতাল চালু না হওয়ায় জনগণের ভোগান্তি এখন চরমে। আমি দুই দফা উদ্যোগ নিলেও অদৃশ্য হস্তক্ষেপের কারণে সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাইনি।

যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠিত সম্পদ নষ্ট করা সহজ কিন্তু গড়া খুবই কঠিন কাজ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর স্নেহধন্য থাকার পরেও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় আমাকে ঘাম ঝরাতে হয়েছে। একটি বড় ধরনের প্রকল্প তৈরি থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কাজ তুলে আনার জন্য বারবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে হয়, দেখা করতে হয়, তাগাদা দিতে হয়, প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া জানতে ও বুঝতে হয় (কারণ একটি প্রকল্প অনেকগুলি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসে) এবং সর্বোপরি কাজটি আদায়ের জন্য লেগে থাকতে হয়।

আমি আমার প্রতিটি কাজ এভাবেই আদায় করেছি। অনেকে কথায় কথায় এই কাজ টেন্ডার হয়ে যাচ্ছে, এই কাজ দ্রুত অনুমোদন হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি বলে জনগণকে প্রায়শঃই আশ্বাস দিয়ে থাকেন, কিন্তু ফলাফল পাওয়া যায় না। কারণ তারা প্রক্রিয়া জানেন না এবং লেগে ও থাকেন না এবং শেষমেশ আমলাদেরকে দোষারোপ করে নিজে বাঁচার চেষ্টা করেন।

২০ শয্যার এই হাসপাতালে একজন ডাক্তার আর কিছু ওষুধ দিলেই চালু হবে না। এর জন্য ডাক্তার, নার্স, টেকনিক্যাল স্টাফ ও অন্যান্য জনবল কাঠামো (মোট ২১টি পদ) এবং শয্যাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কাঠামো অনুমোদন করতে হবে, অতঃপর তাদের নিয়োগ করতে হবে। এ কাজের জন্য ৩টি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয় যার কোনটিই আমার জানামতে এখনও হয়নি। আমি যা জেনেছি তাতে বোঝা যায় যোগাযোগের প্রচন্ড ঘাটতি রয়েছে।

প্রায় ৮ কোটি টাকায় নির্মিত এই হাসপাতালটি তাই কারো মুখের কথায় চালু হবে না। এটি চালু করতে হলে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পরিশ্রম করার ইচ্ছা, যোগ্যতা ও সামর্থ্য। দেখে শুনে যা মনে হয় স্থানীয়ভাবে এটি চালু করার আন্তরিক ইচ্ছা ঘাটতিসহ স্থানীয় অপরাজনীতির অপকৌশলের কারণে হাসপাতালটি চালু হচ্ছে না এবং হবেও না, আর আমাকে তো কাজ করার সুযোগই দেয়া হচ্ছে না।

তাই এখনই সময় দল-মত নির্বিশেষে সকলে মিলে শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধনসহ এমন কিছু করা যাতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত মনোযোগ আকর্ষণ করা যায় এবং তাতেই আমি পূর্ণ আশাবাদী সফলতা আসবে। আমি এর জন্য যে কোনো উদ্যোগের সম্মুখে থাকতে রাজি আছি।

লেখক-মিজানুর রহমান
সাবেক উপ-সচিব গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।