কুড়িগ্রামে নদ-নদীতে আবারও পানি বৃদ্ধি, ডুবে গেছে নিম্নাঞ্চল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ০৯:৪৬ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

পানির ধুরুম ধারাম শব্দোত হামার ঘুম ভাঙে। ঘুম থাকি জাগি দেহি ঘরের ধাপড়ি ভাঙার মুকোত। ঘর সরাইতে না সরাইতে একটা ধাপড়ি ভাঙি চলি যায় নদীত। গ্রামোত শুরু হয় চিল্লাচিল্লি। আইত থাকি সগাই ভাংগাভাংগিত। এলা হামরা কোনটাই যামো বাহে।

এভাবেই বলেছিলেন, কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের বলদিয়া গ্রামের পঞ্চান্ন বছর বয়সী ছকিনা বেগম। স্বামী হারা ৪ সন্তানের জননী ছকিনা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন জানেন না। একে একে ওই এলাকার ২০টি বাড়ি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হুমকিতে রয়েছে আরও ২০টিরও অধিক বাড়ি। ভাঙনে দিশেহারা মানুষজন বাড়ি ঘর ভেঙে নিয়ে উঁচু বাধে ও রাস্তায় অবস্থান করছে।

উজানের ভারী বৃষ্টিপাতের ঢলে কুড়িগ্রামে আবারও পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদ-নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে এসব এলাকার আমন ক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসল। পানি বাড়ার সাথে সাথে তীব্র হয়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তার ভাঙন। পর পর ৫ম দফা বন্যায় নদী পাড়ের মানুষজন ফসল হারানোর পাশাপাশি ঘর-বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

Kurigram

আজ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে সরেজমিনে যাত্রাপুরের বলদিয়া গ্রামে গিয়ে ছকিনার মতো অনেকেরই একই পরিস্থিতির চিত্র দেখা যায়।

ছকিনার মতো একই পরিস্থিতির শিকার ষাটোর্ধ্ব বাচ্চু মিস্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গতকাল এ জায়গাটিতে আমার ঘর ছিল। আজ বাড়ি ভাঙনের হুমকিতে পড়ায় সবাই মিলে বাড়ি-ঘর ভাঙা শুরু করি। আমার নেই কোনো আলাদা জমি যে বাড়ি ভেঙে নিয়ে সেখানে গিয়ে উঠবো। এ বৃদ্ধ বয়সে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠবো জানি না।

একই এলাকার সাহেব আলী জানান, কয়েকদিন আগে বন্যায় বাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন। আবারও দুদিন থেকে বন্যার পানির তীব্র স্রোতে বাড়ি সরিয়ে নিতে হচ্ছে। বাড়ি-ঘর রক্ষা করা তো দূরের কথা নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন নিয়ে বসতভিটা ছাড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য ভোলা মিয়া জানান, গতকাল রাত থেকে ধরলার পানি বৃদ্ধি পেয়ে পানি প্রবেশ করেছে আমার ইউনিয়নের বলদিয়া গ্রামে। ইতোমধ্যে ২০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও ২০টিরও অধিক বাড়ি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। ভাঙনের শিকার হওয়া পরিবারগুলোকে উঁচু স্থানে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ভাঙনে তলিয়ে গেছে রোপা আমনসহ অন্যান্য ফসল।

Kurigram-1

যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী সরকার বলেন, আমি বিষয়টি অবগত হয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যকে পাঠিয়েছি। এবং ইউএনও ভাঙনের তালিকা চেয়েছেন। আমরা তালিকা প্রস্তুত শুরু করেছি। তালিকা অনুযায়ী ইউএনও ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ বন্যার পানি স্থায়ী হবে না। দু’একদিনের মধ্যে পানি নেমে যাবে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আমরা নদী ভাঙন কবলিত এলাকাগুলোতে ভাঙন রোধে জিওব্যাগ ফেলা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। পাইলিং দেয়া হচ্ছে এবং বন্যা পরবর্তী নদীর তীর সংরক্ষণ করা হবে।

রাজারহাট আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার শুক্রবার বিকেল ৩টার রিপোর্ট অনুযায়ী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৫ মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সরকার জানান, নদী ভাঙনের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর প্রাপ্ত তালিকা সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। এখনও বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ আসলে তা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণ করা হবে।

এমএএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]