সার নিয়ে কারসাজি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ১১:১৫ এএম, ১৬ নভেম্বর ২০২০

ঠাকুরগাঁওয়ের সার বিক্রেতারা বিভিন্ন কৌশলে বেশি দামে রাসায়নিক সার বিক্রি করছেন সাধারণ চাষিদের কাছে। কোনো উপায় না পেয়ে ১১শ টাকার সার ১৪শ টাকায় কিনতে হচ্ছে চাষিদের।

সার ডিলারদের ক্যাশ মেমোর মাধ্যমে চাষিদের কাছে সার বিক্রির নিয়ম থাকলেও বেশি দামে বিক্রির কারণে তা করছেন না ডিলাররা। এমন নানা রকম কারসাজি চালালেও কৃষি বিভাগের কোনো তদারকি নেই বললেই চলে। কৃষি বিভাগ অপেক্ষায় আছে চাষিদের লিখিত অভিযোগের আশায়।

প্রতিটি ইউনিয়নে ২-৩ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিযুক্ত আছেন চাষিদের সেবায়। তারপরও অদৃশ্য কারণে এসব দেখার যেন কেউ নেই।

উত্তরের সবজির জেলা হিসেবে পরিচিত ঠাকুরগাঁও। সকল প্রকার সবজি চাষ হয় এ জেলায়। জেলার চাহিদা পূরণ করে বিভিন্ন জেলাসহ বিদেশেও সবজি রফতানি করেন চাষিরা। তবে সবজি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার অধিক দামে কেনার কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ চাষিদের।

চাষিদের অভিযোগ, সার ডিলারদের কাছে সরকারি দরে ক্যাশ মেমোসহ সার কিনতে গেলে সার টিএসপি সার নেই বলে জানিয়ে দেয়। আর বেশি দামে নিলেই পাওয়া যায় পর্যাপ্ত সার। তাই ডিলাররা সারের ১-৫ বস্তার মেমো না করে বিভিন্ন দোকানদারের নামে শত শত বস্তার মেমো করছেন। আর সাধারণ চাষিদের কাছে মেমো ছাড়া বেশি দামে বিক্রি করছেন।

বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক সারের সরকারি মূল্য ডিলার পর্যায়ে ৫০ কেজির ১ বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) (সাদা-কালো) ১ হাজার টাকা আর চাষি পর্যায়ে ১ হাজার ১শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, কালো টিএসপি ১ হাজার ৪শ থেকে সাড়ে ৪শ টাক, সাদা টিএসপি ১ হাজার ২৫০ থেকে এক হাজার ৩শ টাকা, ডিএপি সার ডিলার পর্যায়ে ৭শ টাকা আর চাষি পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৮শ ২০-৫০ টাকা, নাইট্রোজেন জাতীয় সার (ইউরিয়া) ডিলার পর্যায়ে ৭শ টাকা আর চাষি পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৭শ ৬০ টাকা। ডিলার পর্যায়ে মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ৬শ ৫০ টাকা আর চাষি পর্যায়ে ৭শ ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে ৭শ টাকা।

রাসায়নিক সারের ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা চাষিদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে একেক মৌসুমে একেক সারের দাম বৃদ্ধি করে কৃষকদের প্রতারিত করছে। গত আমন মৌসুমে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের ৫০ কেজির বস্তায় ১শ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছিল। পরে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাজার নিয়ন্ত্রণে আনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডসি)।

কৃষি বিভাগ ও বিএডিসি সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ে বাফারের নিবন্ধিত ডিলার ৬৩ জন, যারা জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ইউরিয়া সার বিক্রি করবে আর বিএডিসির ডিলার আছেন ২১০ জন তারা শুধু মাত্র নন-ইউরিয়া সার (টিএসপি, ডিএপি, এমওপি) বিক্রি করবেন।

কৃষি বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী সারের সরবরাহ নিশ্চিত করবে বাফার ও বিএডিসি। তবে বিএডিসির ২১০ জন ডিলারের মধ্যেই বাফারের ৬৩ জন ডিলার অন্তর্ভুক্ত। তাই বাফারের ৬৩ জন ডিলার সকল প্রকার সারের বরাদ্দ পান। আর বিএডিসির ডিলাররা শুধুমাত্র নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ পান।

বিএডিসির একাধিক ডিলার বলেন, বিএডিসির সাধারণ ডিলাররা প্রতি মাসে নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ পান এক থেকে দেড় মেট্রিক টন আর বাফারসহ বিএডিসির ডিলাররা মাসে বরাদ্দ পান ৬০-৭০ মেট্রিক টন। তাই সারের বাজার তাদের হাতে।

গত শনিবার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা সদরে বাফার ও বিএডিসির ডিলার কবীর এন্ট্রারপ্রাইজের ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের কাছে সার কিনতে গেলে তিনি প্রথমে টিএসপি সারের মূল্য চান এক হাজার চারশ টাকা। টাকার ক্যাশ মেমো চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে সারের মেমো দেয়া হয় না।

পরে সংবাদকর্মী পরিচয় পাওয়ার পর তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দের সার সরকারি দরে আর বাইরে থেকে আনা টিএসপি কালো সার এক হাজার ৪শ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা সদরের খুচরা সার বিক্রেতা জুয়েল রানা বলেন, ডিলারদের কাছ থেকে এক হাজার ৪শ টাকায় কিনে বাইরে ১০-২০ টাকা লাভ করে বিক্রি করছি। সার নিলে ডিলাররা ক্যাশ মেমো দেয় না।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হরিহরপুর এলাকার চাষি বেলাল হোসেন বলেন, এখন শুধুমাত্র আগাম সবজির চাষ শুরু হয়েছে, তাতেই বাজারগুলোতে তিন থেকে সাড়ে তিনশ টাকা বেশি দিয়ে সারের বস্তা কিনতে হচ্ছে। বেশি পরিমাণে আলু, গম ও ভুট্টা লাগাতে শুরু হলে আরও যে কী অবস্থা হয় তা বলতে পারছি না।

তিনি বলেন, আলু লাগাব, তাই তিন দিন থেকে সদর রোড, শিবগঞ্জ ও পল্লী বিদ্যুৎ বাজারে বিএডিসির ডিলারসহ অনেক সারের দোকানে সার কিনতে গিয়েছি, সবার দাম এক। তারা বস্তায় ৩শ টাকা বেশি নেবে কিন্তু মেমো দেবে না।

আলুসহ বিভিন্ন সবজি ও দানা জাতীয় ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সারের মধ্যে বেশি প্রয়োজনীয় ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সরকার নির্ধারিত মূল্যে জেলার কোথাও সার বিক্রি হচ্ছে না।

জেলায় সারের ব্যবসা হাতেগোনা কয়েকজন ডিলারের মাধ্যমে চলার কারণে বেশির ভাগ সময় কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগিদের।

এ বিষয়ে বিএডিসি ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি এনামুল হক সরকার বলেন, সার ডিলারদের কোনো সিন্ডিকেট নেই, তবে সমিতি আছে। নিয়ম অনুযায়ী ডিলাররা সার উত্তোলন করে সরকারি দরে বিক্রি করছে। তবে চাহিদার চেয়ে টিএসপি সারের সরবরাহ কম, সেজন্য ডিএপি সার ব্যবহার করতে চাষিদের উৎসাহ দিচ্ছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আফতাব হোসেন বলেন, সরকারের মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেননি। কৃষি বিভাগ চাষিদের টিএসপি সারের পরিবর্তে ডিএপি সার ব্যবহার করতে বেশি উৎসাহি করছে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের তদারকি জোরদার করা হয়েছে। কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে বেশি দামে সার বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেলে তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

তানভীর হাসান তানু/এফএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]