মতবিনিময় সভায় পরস্পরকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দুই প্রার্থীর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ০৫:৫৪ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২১

বরগুনা পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে মেয়র, কাউন্সিলর ও নারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় তুলেছেন প্রার্থীরা। মেয়র থেকে শুরু করে কাউন্সিলর প্রার্থীরা একে অপরকে দুষেছেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় বরগুনা সদর থানা প্রাঙ্গণে এ সভার আয়োজন করে বরগুনা সদর থানা পুলিশ।

সভায় পুলিশ সুপারসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

jagonews24

সভায় পুলিশের পক্ষ থেকে আমন্ত্রিত প্রার্থীদের বক্তব্য শোনা হয়। শুরুতে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর রইসুল আলম রিপন বক্তব্য রাখেন। তিনি তার ওয়ার্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী মোশাররফ হোসেন খানের বিরুদ্ধে তার (রইসুল আলম রিপনের) সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তোলেন। বলেন, ‘তিনি (মোশাররফ হোসেন খান) আমার কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। বিশেষ করে মোশাররফ হোসেন খানের ছেলে মুরাদ খান যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, মাদকসহ ধরা পড়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন, সেই মুরাদ খানের নাকি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ক্লাসমেট। তার ক্ষমতা দেখিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি আমাদের ভীতি প্রদর্শন করছেন। আমার জানামতে, তার কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে। আমরা তার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।'

রইসুল আলম রিপনের বক্তব্যের জবাবে মোশাররফ খান পাল্টা রিপনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, ‘রিপন আমাকে উদ্দেশ করে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। রিপনের ছেলে জন ছেলেপান নিয়ে আমাকে ধাওয়া করেছেন। আমি ভয়ে বাসায় ঢুকে পড়ি। আমি এর প্রতিকার চাই।’

jagonews24

এরপর চার নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্রার্থী শহিদুল ইসলাম নান্না বক্তব্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আকতারুজ্জামান লিমনের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন ও গিতার কসম করিয়ে ভোটারদের টাকা দেয়ার অভিযোগ আনেন। সেখানে উপস্থিত একই ওয়ার্ডের অপর কাউন্সিলর প্রার্থী গৌরাঙ্গ সিকদার শিবু নান্নার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনে বলেন, ‘আমাদের ওয়ার্ডে ভোট কেনার প্রচলন নান্নাই শুরু করেছিলেন। তিনি এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটিয়েছেন এবং টাকার বিনিময়ে প্রভাব খাটিয়ে ভোট কিনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।’

এ অভিযোগ খণ্ডন করে আকতারুজ্জামান লিমন বলেন, ‘শহীদুল ইসলাম নান্না এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি করেছেন। তিনি ভোটারদের বলে বেড়ান, আমার নির্বাচন ভোটের আগের রাতের। অর্থাৎ ভোটের আগের রাতে তিনি টাকায় ভোট কিনবেন।’

একইভাবে ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী কবিরুরু রহমান বলেন, ‘গতকাল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আমার কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে কুপিয়ে একজনকে যখম ও দুজনকে আহত করেছেন। আমি এর প্রতিকার চেয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছি।’

৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফারুক হোসেন সিকদার ও একই ওয়ার্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাসুদ এসময় প্রকাশ্য বিবাদে জড়িয়ে একে অপরের উদ্দেশে অভিযোগ ছুড়ে দেন। মাসুদকে ‘গাঁজাখোর’ উল্লেখ করলে ফারুককেও তিনি ‘ধর্ষক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পরে সেখানে উপস্থিত পুলিশের মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হয়।

jagonews24

পরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আবদুল হালিম ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা জালাল উদ্দীন বক্তব্য রাখেন। উভয়ই কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ না আনলেও আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কার কথা বলেন।

এরপর স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. শাহাদাত হোসেন বক্তব্য রাখেন। তিনি নৌকার মেয়র প্রার্থী কামরুল আহসান মহারাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, ‘আমি নির্বাচনে ভীত-সন্ত্রস্ত। আমার প্রচার মাইকের ব্যাটারি ফেলে দিয়েছেন নৌকার কর্মীরা। এ নির্বাচনে আমার জীবন বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আমি যে কোনো মুহূর্তে হামলার শিকার হতে পারি। আমার নিরাপত্তা নেই। আমার প্রচারণায় প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করছেন নৌকার প্রার্থীর সমর্থকরা। আমি আপনাদের সহায়তা চাই।’

বুধবার (১৩ জানুয়ারি) রাতের হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার পোস্টার পুড়িয়ে দিচ্ছিল নৌকা সমর্থকরা। সেখানের সে দৃশ্য ভিডিও করার জন্য আমার কর্মীদের ওপর হামলা হয়। উপরন্তু পুলিশ আমার কর্মীদেরই আটক করে।’

প্রার্থীদের মধ্যে সর্বশেষ বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ। তিনি বলেন, ‘কালো টাকা ব্যবহার করে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. শাহাদাত হোসেন ভোট কেনার পাঁয়তারা করে আসছেন। গতকাল ৬ নম্বর ওয়ার্ডে মারামারি হয়েছে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে। সেখানে পৌর মেয়র শাহাদাত হামলাকারী প্রার্থীর পক্ষে থানায় এসেছেন। এর শুরুটা কোথায়, এর সাহসটা কোথায়, কে শুরু করেছে এসব?’

‘গতকাল রাত ১টার দিকে আশ্রয়ণ থেকে একের পর এক আমার কাছে ফোন এসেছে। নৌকা সমর্থন করার কারণে আমার লোকজনকে মারধর করে ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে আশ্রয়ণে গিয়ে আমার লোকজনের ওপর হামলা করে আহত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবার তারই প্রশংসা করে প্রচারণা চালাচ্ছেন শাহাদাত ভাই। ঘরের সন্তান যদি অবাধ্য হয়, তবে শৃঙ্খলা আসবে কী করে?’

বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) শহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন-বরগুনা পুলিশ সুপার (এসপি) মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর মল্লিক ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা নির্বাচন অফিসার দিলীপ কুমার হাওলাদার, বরগুনা সদর সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মেহেদি ও বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম তারিকুল ইসলাম প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর মল্লিক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর। নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেব। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করুন। আপনাদের সহনশীলতা আমাদের সবার জন্য কল্যাণকর। সবাই মিলে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের উদাহরণ সৃষ্টি করতে চাই।

প্রার্থীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আপনাদের সবার বক্তব্য আমরা নোট নিয়েছি। প্রতিটি বিষয়েই পুলিশ খোঁজ নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেবে।’

সাইফুল ইসলাম মিরাজ/এসআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]