এখন খেলতে বাধা নেই হীরামণির

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৮:২৭ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২১

ছোট্ট হীরামণি আক্তার। পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে। নিজেদের কোনো ঘর-বাড়ি নেই, অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকে তার পরিবার। সেই ভাড়া বাড়ির উঠানে খেলতে গেলেই বাধা দিতেন বাড়িওয়ালা। ঝালমুড়িওয়ালার মেয়ে বলে কেউ তার সঙ্গে খেলতেও চাইত না। এ নিয়ে ছোট্ট হীরামণির মনে খুব কষ্ট। মেয়ের এমন কষ্টে ডুকরে কাঁদা ছাড়া কিছুই করার ছিল না বাবা-মায়ের।

এখন আর হীরামণির খেলতে কোনো বাধা নেই। আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের চরনারায়ণপুর গ্রামে সরকারিভাবে বাড়ি পেয়েছে হীরামণির পরিবার। সেই বাড়ির সামনে হীরামণির জন্য খেলার জায়গাও রয়েছে। আছে খেলার সাথীও।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় হীরামণির পরিবারসহ আরও অনেক গৃহহীন পরিবার তাদের স্বপ্নের ঠিকানা পেয়েছে। প্রত্যেক পরিবারকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের বাড়ির দলিল।

শনিবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে চরনারায়ণপুর গ্রামে হীরামণির বাড়িতে কথা হয় তার সঙ্গে। ঘরের বারান্দায় বসে খেলা করছিল সে। নিজেদের বাড়ি পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হীরামণি। মেয়ের খুশিতে হাসি ফুটেছে বাবা-মায়ের মুখেও।

আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে হীরামণি জানায়, গরিব বলে সবাই তাদের অবহেলা করত। কেউ তার সঙ্গে মিশতে চাইত না। অন্যের বাড়িতে খেলাধুলা করতে দিত না। চাচার বাড়িতে গেলে চাচা-চাচিও তাকে তাড়িয়ে দিতেন। এখন সরকার তাদের বাড়ি দিয়েছে। এখন আর তার খেলায় কোনো বাধা নেই। খেলার সাথীও আছে তার। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানায় সে।

jagonews24

হীরামণির বাবা লিটন মিয়া বলেন, আখাউড়া উপজেলার গঙ্গাসাগর ইউনিয়নের তুলাবাড়ি গ্রামে আমার বাড়ি। পৈতৃকভাবে আধা শতাংশ জায়গা পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই জায়গাটুকুও ভাইয়েরা আমার কাছ থেকে নিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে বাড়ির পাশে একটি ঘরভাড়া নিয়ে থাকতাম। ঝালমুড়ি বিক্রি করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে সংসার চালাতাম। অনেক সময় ঘরভাড়া দিতে পারতাম না। সেজন্য বাড়িওয়ালা অনেক কথা শুনাতেন, ঘর ছেড়ে দিতে বলতেন। আমার মেয়েটাকে খেলতে দিতেন না, কেউ ওকে খেলায় নিত না। বাবা হিসেবে মেয়ের এই কষ্টে চোখের পানি ফেলা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। সন্তানদের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে পারছিলাম না।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার মা। তিনি আমাকে বাড়ি করে দিয়ে আমার সব কষ্ট দূর করেছেন। কখনো ভাবিনি নিজের একটা বাড়ি হবে। আমার সন্তান নিজ বাড়িতে ঘুমাতে পারবে। আমাদের মতো যেসব গৃহহীনদে বাড়ি করে দিয়েছেন তাদের মনে আজ যে আনন্দ সেটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

বাড়ি বুঝে পাওয়া আখাউড়া উপজেলার মো. আব্দুল কাদির বলেন, বর্ষার সময় নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাই আর সুদিনে বিভিন্ন পণ্য ফেরি করে বিক্রি করি। যে টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চালানোই দায়। পৈতৃকভাবে কোনো সহায়-সম্পত্তি পাইনি। ছেলেমেয়ে নিয়ে অন্যের বাড়িতে খুব কষ্ট করে থাকতাম। নিজে বাড়ি করার সাধ্য ছিল না। এটা নিয়ে কষ্টের শেষ নেই। একটা বাড়ি আমার স্বপ্ন ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার মতো গৃহহীনদের সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

আইয়ূব আলী নামে আরেক উপকারভোগী জানান, স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়ে তার সংসার। আগে রিকশা চালাতেন। এখন বার্ধক্যজনিত কারণে নানা রোগে ভুগছেন, সেজন্য রিকশা চালাতে পারেন না। স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে অন্যের ঘর-বাড়িতে থাকতেন। বাড়ি পাবেন সেটি স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি। এখন বাড়ি পেয়ে অনেক খুশি তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৯টি উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় সরকারি খাসজমিতে ১ হাজার ৯১টি গৃহহীন পরিবারকে বাড়ি করে দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় ৩২টি, বিজয়নগরে ১০০টি, সরাইলে ১০২টি, নবীনগরে ৪৮৫টি, নাসিরনগরে ৯১টি, বাঞ্ছারামপুরে ৬৪টি, আশুগঞ্জে ৬৮টি, কসবায় ১০৪টি ও আখাউড়া উপজেলায় ৪৫টি গৃহহীন পরিবার বাড়ি পেয়েছেন। দুই শতাংশ জমিতে করা ওই বাড়িগুলোতে দুটি থাকার কক্ষ, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট ও বারান্দা রয়েছে। প্রতিটি বাড়ির সামনে করা হয়েছে ফুল ও সবজি বাগান।

শনিবার (২৩ জানুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্বোধনের পর গৃহহীনদের কাছে তাদের বাড়ির দলিল বুঝিয়ে দেয়া হয়।

আজিজুল সঞ্চয়/এআরএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]