সবার ভরসার মানুষটিই আজ পরিবারের বোঝা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ১১:৩৬ এএম, ৩১ মার্চ ২০২১

পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর সংসারের হাল ধরতে টেম্পু চালকের কাজ নেন বাবুল। এক সময় জমি ও গাছ বিক্রি করে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটাতে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু বিধিবাম। সেখানে দুর্ঘটনায় স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেন বাবুল। পরিবারের সকলের স্বপ্ন নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বাবুল আজ সংসারের বোঝা।

ঝালকাঠির রাজাপুরের পুটিয়াখালি গ্রামের বাবুল হোসেনের এখন দু’বেলা খাবার জোটানোই দায়। চার ভাই-বোন ও মা-বাবাকে নিয়ে ছয় জনের সংসারে দিনমজুর বাবাই একমাত্র উপার্জনকারী।

বাবার সেই ঝুপড়ি ঘরের বিছানায় শুয়ে কথাগুলো যখন বলছিলেন, তখন দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল বাবুল হাওলাদারের। এ সময় কষ্টের কথা মনে করে কাঁদছিলেন বাবা সাহেব আলি ও মা ফাতেমা বেগমও।

jagonews24

সাহেব আলি বলেন, ২০০৮ সালে একই গ্রামের মালায়েশিয়া প্রবাসী চাচাতো ভাই চান মিয়ার মাধ্যমে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয় বাবুলকে। তখন তার ৪৫ শতাংশ বসত ভিটা, কৃষি জমির ৩০ শতাংশ ও গাছ বিক্রি করে এবং বাবুলের জমানো টাকা মিলিয়ে মোট দু’লাখ টাকা দেন চান মিয়াকে। আরও দেড় লাখ টাকা বাকি রেখে বাবুলকে মালায়েশিয়ায় পাঠানো হয়।

বাবুল হাওলাদার বলেন, প্রায় পাঁচ বছর সুস্থ থেকেই প্রবাসে কাজ করছিলেন তিনি। ওই পাঁচ বছরে ভিসার বকেয়া টাকা, গ্রামের কিছু লোকের ঋণের টাকা পরিশোধ করেন এবং কিছু টাকা জমাও করেন তিনি।

২০১৩ সালের শুরুতে একটি পরিচিত শ্রমিক দলের সাথে একটি নির্মানাধীন ভবনের কাজে যান বাবুল। সেখানে ওই ভবনের পাইলিংয়ের ওপরের বাড়তি অংশ গ্যাস সিলিন্ডারের দ্বারা কাটছিলেন। পাইলিংয়ের গোড়ায় কিছুটা খনন করা গর্তের ভেতরে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন তিনি।

এ সময় পাইলিংয়ের কাটা বাড়তি অংশ তার মাথায় পড়লে জ্ঞান হারান তিনি। হাত থেকে নিচে পড়ে যায় গ্যাস সিলিন্ডারের হাতল। জ্বলন্ত আগুনের সেই হাতলের ওপর বসে পড়তেই আগুন লেগে যায় তার পরণের প্যান্টে। এ সময় তার কোমড়ের নিচ থেকে পায়ের গোড়ালির সব মাংস পুড়ে যায়।

গর্ত থেকে ধোয়া উঠতে দেখে অন্য সহকর্মীরা দৌড়ে এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রথমে জহুর বারু হাসপাতালে প্রায় এক বছর চিকিৎসা নেন তিনি। ওই হাসপাতালের খরচ প্রায় ৭০ হাজার রিংগিত নির্মাণাধীন ভবনের মালিক পরিশোধ করেন।

পরে আরও দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। সেই খরচ নিজের জমানো টাকা এবং পরিচিত বন্ধুরা বহন করেন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে এসেও ৬-৭ মাস চিকিৎসা নেন তিনি। সেখান থেকে বাড়িতে আসেন।

বর্তমানে তিনি হাঁটতে ও বসতে পারেন না এবং মৃত্যু পর্যন্ত এভাবেই শুয়ে থাকতে হবে তাকে। তবে হুইল চেয়ারে একটু কষ্ট করে কেউ বসিয়ে দিলে বসে থাকতে পারেন।

jagonews24

বাবুল বলেন, তিনি সুস্থ থাকলে তার পাঠানো রেমিটেন্সে দেশের রাষ্ট্রীয় চাকা ঘুরত। আজ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তিনি আজ সংসারের বোঝা।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ফারুক মোল্লা বলেন, বাবুলকে এক বছর আগে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেয়া হয়েছে। সামনে নির্বাচন থাকায় পরিষদের সকল কর্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোক্তার হোসেন বলেন, ওই পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করার সক্ষমতা আমাদের নেই। তবে তারা চাইলে সমাজসেবা অফিস থেকে লোন নিতে সাহায্য করা হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারটি সরকার ও দেশের মানুষের কাছে সাহায্য সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছে।

আতিকুর রহমান/এফএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]