চাকরি-বেতন পৌরসভার, গাড়ি চালান এসিল্যান্ডের!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০৩:০০ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০২১

 

নাম ছহরাপ আলী। তবে সবাই তাকে চেনেন ‘সালমান’ নামে। পেশায় তিনি গাড়িচালক। চাকরি করেন কুষ্টিয়ার মিরপুর পৌরসভায়। তার দায়িত্ব পৌর এলাকার ময়লা পরিবহন করা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন সকালে ছহরাপ আলী কর্মস্থলে গিয়ে হাজিরা খাতায় সই করেই বেরিয়ে পড়েন। পৌর ভবন থেকে বেরিয়ে তিনি চলে যান উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি (এসিল্যান্ড) কার্যালয়ে। সেখানেই দিনভর থাকেন।

পৌরসভার ময়লার গাড়ি চালানোর দায়িত্ব হলেও কখনোই তাকে ময়লা পরিবহনের কাজে দেখা যায়নি।

ভূমি কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছহরাপ আলী মূলত সেখানে তার বড় ভাইয়ের প্রক্সি দেন। তার বড় ভাই সানোয়ার হোসেন ওই ভূমি অফিসের দৈনিক মজুরিভিত্তিক গাড়িচালক। তিনি আবার ভূমি অফিসের গাড়ি না চালিয়ে চালান মিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) গাড়ি। সে কারণেই ভাইয়ের বিপরীতে ছহরাপ আলী ওরফে সালমান এসিল্যান্ডের গাড়ি চালান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুরের ইউএনওর গাড়িচালক এমদাদুল হক বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। সে কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই গাড়ি চালানো থেকে বিরত আছেন। এমদাদুল হকের এই শুন্যস্থান পূরণ করেন ভূমি অফিসের নিয়োগপ্রাপ্ত সানোয়ার হোসেন। এর বিনিময়ে অসুস্থ এমদাদুল হকের বেতন থেকে মাসিক ১২ হাজার টাকা কেটে নিয়ে সানোয়ারকে দেয়া হয়। তিনি নিজে সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। আর সানোয়ার সেই টাকা তুলে দেন ছহরাপের হাতে।

নির্দিষ্ট অফিসে দায়িত্ব পালন না করা অভিযুক্তদের ভাষ্য, ‘এটার নাম মেকানিজম।’

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত বছর মিরপুর উপজেলার এসিল্যান্ড সরকারি গাড়ি পান। সেখানে গাড়িচালক হিসেবে দৈনিক ৪৫০ টাকা মজুরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান সানোয়ার হোসেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, মূলত সানোয়ার নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই গাড়ি চালানোর এই ‘মেকানিজমের’ শুরু। এতে লাভ দুই ভাইয়েরই। এক নিয়োগে আয় করছেন দ্বিগুণ।

এ বিষয়ে ড্রাইভার সালমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি পৌরসভাতেই চাকরি করি। মেয়র মহোদয়ের অনুমতিক্রমেই এসিল্যান্ড স্যারের গাড়ি চালাই।’

পৌরসভার চাকরি করে কীভাবে ভূমি কর্মকর্তার গাড়ি চালানোর বৈধতা রয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বুঝেন না মেয়রের হুকুম ছাড়া এটা কি সম্ভব হয়? আমি নিজে এমন করলে আমাকে ছাড় দেবেন মেয়র?’

এ বিষয়ে ড্রাইভার সানোয়ার হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ভূমি অফিসে মাস্টার রোলে চাকরি করি। ইউএনও স্যারের ড্রাইভার অসুস্থ তাই উনার গাড়ি চালাই। আমার ভাই সালমান মিরপুর পৌরসভায় চাকরি করেন। মেয়র মহোদয়ের হুকুমেই তিনি (তার ভাই) এসিল্যান্ড স্যারের গাড়ি চালান।’

ইউএনওর গাড়িচালক এমদাদুল হক বলেন, ‘নিজে একটু অসুস্থ তাই আমার জায়গায় সানোয়ার নামে একজন গাড়ি চালান। এজন্য তাকে প্রতি মাসে আমার বেতনের টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা দিতে হয়।’

এ বিষয়ে মিরপুর পৌরসভার মেয়র হাজী এনামুল হক বলেন, ‘কেউ যদি অভিযোগ করে তাহলে তারা বিরোধীপক্ষ। পৌরসভা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এসিল্যান্ড চেয়েছেন তাই তাকে সেবা দেয়া হচ্ছে।’

মিরপুরের ইউএনও লিংকন বিশ্বাস বলেন, ‘এটি আমার অফিসের ইন্টারনাল (অভ্যন্তরীণ) ব্যাপার। এটা নিয়ে কথা বলার কোনো যুক্তি নেই। সারাদেশে এমন মেকানিজম করে অনেকেই গাড়ি চালিয়ে থাকেন।’

তিনি আরও জানান, যেহেতু তার দায়িতপ্রাপ্ত ড্রাইভার এমদাদুল হক অসুস্থ সে কারণে কাজ চালিয়ে নিতে এক জনের দায়িত্ব অন্যজন পালন করছেন। ড্রাইভার এমদাদুল হকের বেতন থেকে ১২ হাজার টাকা কেটে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টির খোঁজ-খবর নিচ্ছি। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আল-মামুন সাগর/এসএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]