মোবাইলে ইন্টারনেট ঘেঁটেই রোবট বানিয়ে ফেলল কিশোর সুজন

সাইফ আমীন
সাইফ আমীন সাইফ আমীন , নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৩:৩১ পিএম, ২৪ এপ্রিল ২০২১

বিশ্বের প্রথম রোবট হিসেবে নাগরিকত্ব পেয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘সোফিয়াকে’ টেলিভিশনে দেখে অভিভূত হয়েছিল কিশোর সুজন পাল। এরপর রোবট বানানোর স্বপ্ন বাসা বাঁধে তার মনে। তখন বয়স মাত্র ১৩ বছর, ৮ম শ্রেণির ছাত্র। স্বপ্নবাজ এই মেধাবী কিশোরের স্বপ্নপূরণে ছিল হাজারও বাধা।

তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়া সিলিকন ভ্যালির মতো সুযোগ-সুবিধা নেই সুজন পালের জন্মস্থান বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। বছর পাঁচেক আগেও সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। রোবট তৈরির জন্য আধুনিক গবেষণাগার, যন্ত্রাংশ ও অভিজ্ঞতা অর্জনেরও কোনো সুযোগ ছিল না তার। রোবট নিয়ে আগ্রহ থাকলেও এ বিষয়ে সামান্য জ্ঞান ছিল না তার। আরও একটি বড় বাধা ছিল অর্থের জোগান।

সুজন পালের বাবা জয়দেব চন্দ্র পেশায় কুমোর। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলসি ইত্যাদি নানা তৈজসপত্র তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন তিনি। সেই উপার্জনে কোনোরকম চলে সংসার। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সুজন সবার ছোট।

এ অবস্থায় দরিদ্র পরিবারের সুজনের রোবট তৈরির বিষয়টি ছিল অনেকটা দিবাস্বপ্নের মতো। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাসের জোরে স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছে সে।

বাড়িতে বসেই তৈরি সুজনের মানবসদৃশ রোবট ‘বঙ্গ’ এখন বাস্তব। এটি আশপাশে আগুন লাগলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিকটস্থ ফায়ার সার্ভিস অফিসে এসএমএস পাঠিয়ে জানিয়ে দিতে পারে, বাড়িতে গ্যাসলাইন বা সিলিন্ডার লিকেজ হলে অ্যালার্ম দিয়ে সতর্ক করতে পারে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানাতে পারে এবং ভালো ফলন পেতে কৃষকদের নানা তথ্য দিতে সক্ষম সে।

এছাড়া রোবটটি শিশুদের প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা শেখাতেও সক্ষম। কেউ আঘাত পেলে, কেটে গেলে, জখম হলে, পানিতে ডুবে অসুস্থ হলে, আগুনে পুড়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয় জানিয়ে দিতে পারে বঙ্গ। তার কাছে রয়েছে হাজারও প্রশ্নের সঠিক উত্তর। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে সুজনের রোবটটি। কোথাও আটকে গেলে গুগল-উইকিপিডিয়া ঘেঁটে অনায়াসে উত্তর দিতে পারে সে।

সুজন পাল (১৭) বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের শিহিপাশা গ্রামের জয়দেব চন্দ্র পাল ও সবিতা রানী পাল দম্পতির সন্তান। ২০২০ সালে আগৈলঝাড়া সরকারি গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হয় সরকারি গৌরনদী কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে।

সুজন পাল জাগো নিউজকে জানায়, ‘যখন ৮ম শ্রেণিতে পড়ি তখন টেলিভিশনে সোফিয়াকে দেখে রোবট বানানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। তবে পরিচিত এমন কেউ ছিল না, যে তার মাধ্যমে রোবটিকস বিষয়ে ধারণা নিতে পারি। তখন ইন্টারনেটনির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার ছিল আমার কাছে অসাধ্য ব্যাপার। একটি কম্পিউটার কেনার শখ ছিল। কিন্তু আমাদের পরিবারে তা ছিল বিলাসিতা। তাই কম্পিউটার কেনার চিন্তা বাদ দিয়ে একটি স্মার্টফোন কেনার কথা ভাবতে থাকি। কিন্তু তার জন্যও অর্থের প্রয়োজন। বাবা-মায়ের কাছে স্মার্টফোন কিনে দেয়ার বায়না ধরি। অবশেষে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বাবা একটি স্মার্টফোন কিনে দেন। ফোনটি আমাকে স্বপ্নপূরণের অনেক কাছাকাছি নিয়ে যায়।’

সুজন আরও বলে, ‘করোনার মধ্যে কলেজ বন্ধ। তাই সারাদিন ইন্টারনেট ঘেঁটে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সম্পর্কিত নানারকম লেখা পড়তে শুরু করি। রোবোটিকস বিষয়ে নানা ভিডিও দেখি। তবে রোবট নিয়ে কাজ করা আমার জন্য সহজ ছিল না। কারণ রোবট তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ এই উপজেলা শহরে নেই। বরিশালে গিয়ে খুঁজতে থাকি। কিছু যন্ত্রাংশ পাওয়া গেলেও বেশিরভাগ সেখানেও নেই। এরপর অনলাইনে যন্ত্রাংশ খুঁজতে থাকি। দারাজ ও আলিবাবা ডটকমে যন্ত্রাংশ বিক্রির বিষয়টি চোখে পড়ে। তবে সেখান থেকে যন্ত্রাংশ কিনতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ জোগাড়ে শুরু করি টিউশনি। তবে টিউশনির অর্থও ছিল অপ্রতুল। এরপর বাবা-মা ও বড় ভাইয়ের কাছে নানা কথা বলে টাকা নিতাম।’

সুজন জানায়, ‘চার মাস আগে রোবট তৈরি করতে হাতে-কলমে কাজ শুরু করি। ঝালাই করা (শোল্ডারিং) শিখেছি স্থানীয় দোকানের মেকানিকের কাছ থেকে। প্রথমদিকে বাসার কেউ জানত না। রোবট বানানোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি লুকিয়ে রাখতাম। যখন বাবা বাইরে যেত আর মা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকত, তখন আমি আমার কাজ শুরু করে দিতাম। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কাজ করতাম। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত কাজ করতাম। একদিন বাবা-মা টের পেয়ে গেলেন। গালমন্দ করলেন। তবে পিছু হটিনি। দীর্ঘ চার মাসের চেষ্টায় বাড়িতে বসেই বানিয়ে ফেলি রোবট বঙ্গকে। যেদিন বানাতে সফল হয়েছিলাম, সেদিনই মা-বাবাকে দেখিয়েছিলাম। রোবটটিকে কথা বলতে দেখে তারা বিস্মিত হয়েছিলেন। এরপর বিষয়টি জানাজানি হলে বাড়িতে লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। মানুষ বাবা-মায়ের সামনে আমার প্রশংসা করে। এখন বাবা-মা এ কাজে উৎসাহ দিচ্ছেন।’

উল্লিখিত কাজগুলো ছাড়াও সুজনের রোবটটি বেশ বিনয়ীও। কেউ করমর্দন করতে চাইলে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাত বাড়িয়ে দেয়। ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গুগলের বিশাল তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত থাকে সে।

বঙ্গর মূল কাঠামো তৈরি করা হয়েছে পিভিসি বোর্ড ব্যবহার করে। চার ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার রোবটটির দুটি অংশ। কোমর থেকে পা পর্যন্ত অংশটুকু বাদে উপরের অংশটুকু মূল কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রায় ২০ কেজি ওজনের রোবটটিতে ব্যবহার করা হয়েছে আরডুইনো বোর্ড। পাঁচ ধরনের সেন্সর ছাড়াও হাত ও ঠোঁট নাড়াচাড়া করতে এতে ব্যবহার করা হয়েছে ছোট আকৃতির পাঁচটি মোটর। তাছাড়া বঙ্গ-এর শরীরে আছে অসংখ্য যন্ত্রপাতি। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।

সুজনের জন্য রোবটের যন্ত্রাংশ কেনা অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার। তবে সরকারি-বেসরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে তার রোবটটিকে আরও উন্নত করা সম্ভব, যা মানুষের সাহায্য করতে পারবে বিভিন্নভাবে। যেখানে মানুষের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে, এমন জায়গায় এই রোবটকে কাজ করানো সম্ভব। যেমন দুর্গম জায়গা থেকে কোনো কিছু উদ্ধার করতে ব্যবহার করা যাবে রোবটটি। এছাড়া ভারী বস্তু উত্তোলন এবং শিল্পকারখানায় নানা কাজে ব্যবহার করা যাবে বঙ্গকে। আবহাওয়া ও ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানাতে পারবে তার রোবট।

সুজনের এখন স্বপ্ন রোবটিকস বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়া। সে মনে করে, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে ছোট এই রোবট থেকে হয়তো একদিন আরও বড় কিছু তৈরি করতে পারবে।

তার বাবা জয়দেব চন্দ্র পাল বলেন, ‘আমাদের ছেলে এই বয়সে রোবট বানাবে কল্পনায়ও ছিল না। গত কয়েক মাস সারাদিন ঘরের মধ্যে যন্ত্রপাতি নিয়ে সময় কাটিয়েছে। ওর মা ও আমি এজন্য অনেক বকাঝকা করেছি। একদিন আমাদের ডেকে দেখায় পুতুলের মতো একটি মেশিন তার সঙ্গে কথা বলছে। এখন প্রতিদিনই সুজনের রোবট দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন বাড়িতে ভিড় করে। ইউএনও স্যারও সুজনের খোঁজ নিয়েছেন। সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন সুজনের জন্য আমাদের গর্ব হয়।’

এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবুল হাশেম বলেন, ‘আগৈলঝাড়া উপজেলার শিহিপাশা গ্রামের সুজন পাল কিশোর বয়সে রোবট বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। কারও সাহায্য ছাড়াই এত বড় অর্জন বিশাল ব্যাপার। পরিশ্রম করলে তার মূল্য যে কেউ পেতে পারে তার অনন্য দৃষ্টান্ত সে।’

তিনি আশা করেন, এই রোবট তৈরির বিষয়টি জেনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানচর্চায় আরও বেশি আগ্রহী হবে।

ইউএনও আরও বলেন, ‘সরকারি আর্থিক সহায়তা পেতে সুজনকে আবেদন করতে বলা হয়েছে। সহায়তা প্রাপ্তির জন্য আবেদনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। জেলা প্রশাসক কয়েকবার সুজনের খোঁজ নিয়েছেন। তিনি সুজনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করছি অর্থের জন্য সুজনের উদ্ভাবনী কাজ থেমে যাবে না।’

সাইফ আমীন/এসএস/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected].com