রাস্তা সংস্কারের নামে কাটা হচ্ছে ২০৩টি গাছ!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ১১:১৪ এএম, ২৬ এপ্রিল ২০২১

পৌরসভার রাস্তা সংস্কার কাজের জন্য কুষ্টিয়া শহরের হাসপাতাল সড়কের বড় বড় রেইনট্রি গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। প্রায় ১৬ বছর আগে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় কুষ্টিয়া পৌরসভা রাস্তার দুই ধারে এসব বৃক্ষ রোপণ করে। টেন্ডারের মাধ্যমে মাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার টাকায় ২০৩টি গাছ কিনেছেন ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা। তিনি এরইমধ্যে ৬টি গাছ কেটেও ফেলেছেন। গাছগুলো না কেটেই রাস্তা সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার সুশীল সমাজ ও পরিবেশবাদীরা।

জানা যায়, শহরের সাদ্দাম বাজার থেকে হাসপাতাল মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই ধারে ২০৩টি বড় বড় রেইনট্রি গাছ রয়েছে। এই সড়ক ধরে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল এবং কোর্ট চত্বরসহ শহরের বিভিন্ন গৌন্তব্যে যাওয়া যায়। টেন্ডারের মাধ্যমে রাস্তার দুই ধারের এই গাছগুলো কেটে নেয়ার অনুমতি পেয়েছেন কুষ্টিয়া সদর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওয়াহিদ মুরাদ। তিনি বর্তমানে হরিপুর ইউনিয়ন আওয়মী লীগের সদস্য।

ওয়াহিদ মুরাদ জানান, করোনার কারণে হাতে তেমন কোনো কাজ না থাকায় তিনি পৌরসভার এই টেন্ডারে অংশ নিয়েছেন।

পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রথম দফায় গত ২২ মার্চ টেন্ডারে তিনজন অংশগ্রহণ করেন। সেখানে ওয়াহিদ মুরাদ সর্বোচ্চ দরদাতা হন। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে তিন হাজার টাকা কম হওয়ায় পৌরসভা টেন্ডার বাতিল করে। টেন্ডারের সরকারি মূল্য ছিলো ১ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। দ্বিতীয় দফায় গত ৮ এপ্রিল টেন্ডারে ১ লাখ ৬১ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে তিনি টেন্ডার লাভ করেন।

টেন্ডার গ্রহিতা ওয়াহিদ মুরাদ জানান, গাছগুলো কেটে নিতে পৌরসভা তাকে ১ মাস সময় দিয়েছে। তিনি ১৭ এপ্রিল থেকে গাছ কাটা শুরু করেছেন। মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) বিকেল পর্যন্ত কাটা হয়েছে ৮টি গাছ।
মুরাদ জানান, টেন্ডারের শর্ত মোতাবেক সবগুলো গাছের শেকড় তুলে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে বেশ খরচ হবে। তাছাড়া ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে তার খরচ পড়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬শ টাকা। তাই এসব গাছের কাঠ ও খড়ি বিক্রি করে খুব একটা লাভ হবে না বলে তিনি মনে করছেন।

এদিকে ছায়া এবং অক্সিজেন দেয়া এই গাছগুলো নামমাত্র মূল্যে কেটে ফেলার ঘটনায় কুষ্টিয়ার পরিবেশবাদী ও সুশীল সমাজের নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

কুষ্টিয়া সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব রফিকুল আলম টুকু বলেন, ২০৩টি বড় বড় গাছ মাত্র ১ লাখ ৬১ হাজার টাকায় বিক্রির বিষয়টি রীতিমতো হাস্যকর। তার দাবি এই গাছগুলোর মূল্য কোনো অবস্থাতেই ১০ লাখ টাকার নিচে হবে না। তিনি পৌরসভার টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

রফিকুল আলম বলেন, পরিবেশ-প্রকৃতির জন্য গাছগুলো রেখে দেয়া দরকার। এই গাছগুলোই ওই সড়কটিকে দীর্ঘদিন ধরে ছায়া দিয়ে রেখেছে। কুষ্টিয়া পৌরসভা এই গাছগুলো কেটে ফেলার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমি তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে গাছ কাটা বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সরওয়ার মুর্শেদ রতন বলেন, প্রকৃতির প্রতি মানুষের অত্যাচার বেড়েছে। যে কারণে প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিচ্ছে। করোনাভাইরাস তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।

এসব গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত দেয়া কোনো অবস্থাতেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে না বলে মনে করেন তিনি।

তিনি যশোর রোডের গাছের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভারতের প্রান্তে গাছ রেখে সড়ক করা হলো আর বাংলাদেশে কেটে ফেলা হলো। তিনি এই গাছগুলো রেখে সড়ক সংস্কারের দাবি জানান।

পরিবেশবীদ খলিলুর রহমান মজু বলেন, লকডাউনের মধ্যে আমরা এর প্রতিবাদ করতে পারছি না। এ কারণেই হয়ত এই সময়টাকেই বেছে নেয়া হয়েছে। তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে এই গাছগুলো রেখে দেয়ার জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আকুতি জানান।

একইসাথে তিনি রাস্তার পাশে দোকান ভেঙে দিয়ে সড়ক প্রশস্ত করার দাবি জানান।

তবে কুষ্টিয়া পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম দাবি করেন, গাছ রেখে কোনোভাবেই এই সড়ক সংস্কার করা সম্ভব নয়। হাসপাতালে রোগীদের যাতায়াতের জন্য সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছগুলো কাটার পর প্রথমে সড়কটি মেরামত করা হবে। এর খানাখন্দ বন্ধ করে কার্পেটিং করে দেয়া হবে। এরপর সড়কটি প্রশস্ত করার চিন্তা রয়েছে পৌরসভার।

আগামী বছর মার্চের দিকে সেই কাজ হবে বলে জানান প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম।

এই গাছগুলো সামাজিক বনায়নের। উপকারভোগীদের সঙ্গে চুক্তি করে ১৬ বছর আগে গাছগুলো রোপণ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ বছর পার হলেই গাছ কেটে ফেলার কথা। এখান থেকে ৭০ শতাংশ টাকা পাবেন সমিতির উপকারভোগীরা। বাকি টাকা পৌরসভার বলেও জানান তিনি।

রবিউল ইসলামের দাবি, টেন্ডারের সব নিয়ম যথাযথ অনুসরণ করেই টেন্ডার করা হয়েছে।

যশোর বন সার্কেলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করীম বলেন, বনজদ্রব্য পরিবহন (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০১১ এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এমন সড়ক ও জনপথ হতেও বনজদ্রব্য আহরণ, অপসারণ বা পরিবহনের জন্য ওই ভূমি নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বরাবর ফরম-৩ এ আবেদন করতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালকের আবেদন করার নিয়ম রয়েছে।

পৌরসভা বা কোনো কর্তৃপক্ষ এমন কোনো আবেদন বা অবহিতপত্র দেননি বলে জানান কুষ্টিয়া সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ছালেহ মো. সোয়াইব খান।

তিনি বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ এই গাছগুলোর মূল্য নির্ধারণের জন্য বন বিভাগকে চিঠি দিয়েছিল মাত্র। তবে গাছ কাটার বিষয়ে কোনো অনুমতি তারা নেয়নি।

আল-মামুন সাগর/এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।