দবির উদ্দিনের বয়স্ক ভাতা গেল তরুণ জুরান আলীর মোবাইলে!

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ১০:৫১ এএম, ১৯ জুন ২০২১

সত্তর বছরের বৃদ্ধ দবির উদ্দীন। তিন বছর আগে সরকারের বয়স্ক ভাতাভোগীর তালিকায় নাম ওঠে তার। এরপর থেকে অন্তত ৩০ মাস ভাতার টাকাও উত্তোলন করেছেন। কিন্তু গত ছয়-সাত মাস ধরে বয়স্কভাতার টাকা পাচ্ছেন না তিনি। চলতি মাসে তিন হাজার টাকা ভাতাপ্রাপ্তির তালিকায় নাম থাকলেও কানাকড়িও পাননি তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেল বৃদ্ধ দবির উদ্দিন ভাতাভোগী হলেও তার টাকা তুলেছেন জুরান আলী নামে এক যুবক।

দবির উদ্দিন একাই নন, তার মতো ভুক্তভোগী অনেকেই। ডিজিটাল ‘মারপ্যাঁচে’ দরিদ্রদের জন্য সরকারের দেয়া বিশেষ ভাতার টাকা এভাবেই নয়-ছয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায়।

বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা নয়ছয় ও নৈরাজ্য হলেও সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা দফতরের কর্মকর্তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। এক্ষেত্রে, ‘করার কিছুই নেই’ বলে দাবি তাদের।

তারা বলছেন, ‘মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সরকারি এসব ভাতার টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীর মোবাইল নম্বরে দেয়া হচ্ছে। তাই ভুল নম্বরে টাকা গেলে আমরা কী করব?’

যদিও সুবিধাভোগীদের তালিকা ও মোবাইল নম্বর স্থানীয় সমাজসেবা কর্মকর্তারাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন।

উপজেলা সমাজসেবা অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, শেরপুর উপজেলায় মোট ভাতাভোগীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৮৩৩ জন। এর মধ্যে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ১০ হাজার ৫৪ জন, বিধবা ভাতাভোগী রয়েছেন ৪ হাজার ১২১ জন ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী ৩ হাজার ৬৫৮ জন।

এর আগে, ব্যাংকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এসব ভাতার টাকা বিতরণ করা হতো। এতে ভোগান্তির পোহাতে হতো ভাতাভোগীদের। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকারি সব ভাতার টাকা এমএফএস-এর মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর মোবাইল নম্বরে পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রম চালু করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিমাস ৫০০ টাকা হিসেবে ৬ মাসের বয়স্কভাতার মোট তিন হাজার টাকা সুবিধাভোগীর মোবাইল নম্বরে একত্রে পাঠানো হয়। একইভাবে বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকাও বিতরণ করা হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়।

কিন্তু পাঠানো এসব টাকার সিংহভাগ গায়েব হয়ে যাওয়ায় কোনো টাকাই পাননি ভাতাভোগীরা।

উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সাধুবাড়ী গ্রামের ভুক্তভোগী বৃদ্ধ দবির উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ‘বিগত ছয় মাসের বয়স্কভাতার কোনো টাকা পাইনি। আমি সঠিকভাবেই মোবাইল নম্বর দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো টাকা আসেনি। তাই উপজেলা সমাজসেবা অফিসে বার বার ধর্না দিয়েও কোনো ফল পাইনি। তবে অফিসের স্যাররা বলেছেন, আপনার টাকা জুরান আলী নামে এক ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে চলে গেছে। অতএব তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এরপর জুরান আলীর সঙ্গে কথা বললে তিনি টাকা উত্তোলনের কথা স্বীকার করলেও খরচ হয়ে যাওয়ায় ফেরত দিতে অপরাগতা জানিয়েছেন।’

একই অভিযোগ করেন উপজেলার উচ্চরং গ্রামের বয়স্কভাতাভোগী মো. মকবুল হোসেন, ছিয়াতুন বিবি ও জামেনা বিবি।

এসব ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এবারের কোনো ভাতার টাকা পাননি তারা। অথচ টাকা বিতরণের তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। স্থানীয় সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, তাদের ভাতার টাকা ভুল মোবাইল নম্বরে চলে গেছে। তাই এসব টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
মনোয়ারা বেগম নামের এক বিধবা ভাতাভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুনেছি আমাদের ভাতার টাকা বলে গায়েব হয়ে গেছে। হয়ত জিন-ভূত নিয়ে গেছে, তাই টাকা পাইনি।’

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুসুম্বী ইউনিয়নের একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘আমার জানামতে অন্তত ১০ সুবিধাভোগী এবারের সরকারি ভাতার কোনো টাকা পাননি। বিভিন্ন দফতরে বার বার ধর্না দিয়েও টাকা না পেয়ে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’

কথা বলা হলে তালিকাভুক্ত সুবিধাভোগীদের কাছে ভাতা না পৌঁছানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু এখানকার সমস্যা নয়। সারাদেশেই এটি হয়েছে। আমরা ভাতাভোগীদের যেসব নম্বরে টাকা পাঠানোর জন্য দিয়েছিলাম সেগুলোতে না পাঠিয়ে ভুল নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে। তাই বিগত ছয় মাসের ভাতার টাকা অনেকেই পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।’

তিনি দাবি করেন, ‘এক্ষেত্রে আমাদের কোনো অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা নেই।’ ভুলবশত মোবাইলে টাকা পাওয়া ব্যক্তিদের দু-একজন ফেরত দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘এমনটি হওয়ার কথা নয়। ভুল হলে দু-একজনের ক্ষেত্রে হতে পারে কিন্তু বেশিরভাগ মোবাইল নাম্বার ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমন হলে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এসএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]