শিক্ষিকা রাবেয়ার দুই কিডনিই অকেজো, বাঁচতে চান মেয়ের জন্য

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশিত: ০৪:৫৬ পিএম, ২৩ জুলাই ২০২১

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের প্রীতি হায়দার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রাবেয়া আক্তারের দুটি কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। তিনি এখন তার সাতবছর বয়সী মেয়ে ফারিয়ার জন্য এ পৃথিবীতে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার আকুতি জানিয়েছেন।

রাবেয়ার স্বামী আফসার উদ্দিন একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। স্বামী, সন্তান নিয়ে খুব সুখেই কাটছিল রাবেয়ার সংসার। কিন্তু ২০১৮ সালে দুটি কিডনি নষ্টের খবর জীবনের সব সুখ কেড়ে নেয় রাবেয়ার। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব এ পরিবারটি থাকছে অন্যের বরাদ্দ পাওয়া আবাসনে। সপ্তাহে দু’বার রাবেয়ার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়, যার ব্যয়ভার পরিবারটি আর বহন করতে পারছে না।

কথা বলে জানা গেছে, করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যার ফলে এই শিক্ষক দম্পতির আয়ের উৎস হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও স্বামী আফসার উদ্দিন টিউশনি করিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেই পরিবারের ভরণপোষণ করছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অধিকাংশ শিশুকেই প্রাইভেট পড়ান না অভিভাবকরা।

jagonews24

রাবেয়া আক্তারের বাবা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়ি লালুয়া ইউনিয়নের চৌধুরী পাড়া গ্রামে। সেখানে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করে আমি প্রীতি হায়দার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলাম। যার উদ্দেশ্য ছিল আমার মেয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতে পারবে। সেখানে আমার মেয়ে ও জামাই দুই জনই শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। করোনার কারণে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আমার মেয়ে-জামাই বেকার হয়ে যায়। হটাৎ করে আমার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিয়ে যাই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানতে পারি আমার মেয়ের দুটি কিডনি বিকল হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এদিকে পায়রা বন্দরের ভূমি অধিগ্রহণের ফলে আমার ভিটে-মাটি সব নিয়ে যায়। অধিগ্রহণে পাওয়া প্রায় পঁচিশ লাখ টাকা মেয়ের চিকিৎসায় ব্যয় করেছি। এখন আমার কাছে আর নগদ কোনো অর্থ নেই। এই অবস্থায় মেয়েকে সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস করার মতো টাকা জোগাড় করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই কোনো সহৃদয় ব্যক্তি অথবা সরকার যদি আমার অসহায় পরিবারের দিকে তাকায় তবে মেয়েটা বেঁচে যেত।’

স্থানীয় বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী ফুর্তি তালুকদার বলেন, ‘এই পরিবারটি সম্পর্কে আমি জানি। আমার কাছ থেকে অনেক ওষুধ কিনেছেন তারা। একসময় তাদের অবস্থা ভালোই ছিল। রাবেয়ার অসুস্থতার কারণে আজ তারা নিঃস্ব হয়ে গেছে।’

রাবেয়া আক্তারের স্বামী আফসার উদ্দিন বলেন, ‘আমি শিক্ষক ছিলাম। টিউশনি করিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে স্ত্রী, মেয়েকে নিয়ে সুখেই ছিলাম। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় টিউশনি নেই। স্ত্রীর অসুস্থতায় নিজের সহায়-সম্বল হারিয়ে দিন মজুরের কাজ করে মানুষের কাছে হাত পেতে সংসার চালাতে হয়। কোনোদিন কাজ পাই, আবার কোনো দিন পাই না।’

ডায়ালাইসিস ও ওষুধ কিনতে কষ্ট হয় জানিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি গত তিন বছরে সবমিলিয়ে ত্রিশ লাখ টাকার ওপরে ব্যয় করেছি চিকিৎসায়। একটা চৌকি কিনে অসুস্থ স্ত্রীকে শোয়াতে পারি না। আমার মেয়েটি এতিম হয়ে যাবে ভাবতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংসারের রান্নাসহ সব কাজ আমাকেই করতে হয়। রাবেয়ার ওষুধ খাওয়ানো, সেবা এবং মেয়ের যত্ন নিয়ে কাজে যাওয়ার সময় থাকে না। তার দুটি কিডনিই শতকরা নব্বই শতাংশের বেশি বিকল হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমি সমাজের বিত্তবান শ্রেণির মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি।’

jagonews24

নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাবেয়া আক্তার বলেন, ‘নিজের চলার মতো কোনো ব্যবস্থা নাই। ডায়ালাইসিস করে আমার বেঁচে থাকা লাগে। সপ্তাহে দু’দিন ডায়ালাইসিস করা আমাদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। আমরা দুইজন শিক্ষকতা করে ভালোই ছিলাম। কিন্তু আল্লাহ পাক আমার সে সুখ দীর্ঘস্থায়ী হতে দিল না।’

কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম রাকিবুল আহসান বলেন, ‘এটা একটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা। এ চিকিৎসায় সে সব খুইয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ রোগের পরিণতি হচ্ছে নিজে শেষ হয়ে সাথে পরিবার নিঃস্ব হওয়া। আমি আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে কিছু সাহায্য করবো এবং উপজেলা পরিষদে আলোচনা করে চেষ্টা করবো মেয়েটির জন্য কিছু করা যায় কি-না। তাকে যে যা পারেন আর্থিক সহযোগিতা করুন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসানাত মো. শহীদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আপনার মাধ্যমে মেয়েটির অসুস্থতার কথা জেনেছি। এ ধরনের অসহায় মানুষের পাশে কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন সবসময় থেকেছে। রাবেয়ার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না।’

এমআরআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।