‘বক-পানকৌড়ির নিরাপদ প্রজনন গ্রাম’ বলিহরপুর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১০:১২ এএম, ৩০ জুলাই ২০২১

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় ‘বক ও পানকৌড়ির নিরাপদ প্রজনন গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে বলিহরপুর গ্রাম। এই গ্রামে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে শত শত বক ও পানকৌড়ি পাখি। মহাসড়কের পাশে এই গ্রামে পাখি দেখতে আসে পাখি প্রেমীরা। আবার চুপিসারে কেউ পাখি শিকার করতে গেলে গ্রামবাসীর তোপের মুখে তারা টিকতে পারে না।

গ্রামের মানুষ প্রজননের জন্য আসা অতিথি পাখিগুলোকে পরিবারের সদস্যের মতো ভালোবাসে। নিরাপদ প্রজনন আবাসস্থল হিসেবে এই গ্রামে গাছের ডালে ডালে বক ও পানকৌড়ির পাখির দল রাত যাপন করেছে। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখিরা কিচিরমিচির ডাকের মধ্য দিয়ে জানান দেয়, সারা দিনের মতো আমরা খাবারের সন্ধানে বের হচ্ছি। সেই থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মা পাখিরা ফিরে না আসা পর্যন্ত গ্রামের মানুষ পাখিদের বাসা, ডিম ও বাচ্চাদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন।

এই বক ও পানকৌড়ির কিচিরমিচির শব্দে ফুলবাড়ী উপজেলার ২নং আলাদিপুর ইউনিয়নের বলিহরপুর গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙে। আবার এমন করে প্রতিটি সন্ধ্যা নামে বক ও পানকৌড়ির এমন কলতানে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গ্রামের গাছে গাছে যেন থোকায় থোকায় পাখির সাদা কালো ফুল ফুটে আছে।

Heron1

এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে খাদ্য সংকটে পড়েছে বক ও পানকৌড়ীগুলো। গ্রামের মানুষের অভিমত সরকারিভাবে খাবার ব্যবস্থা করা গেলে এই এলাকায় শুধু বক ও পানকৌড়ি নয়, অন্যান্য প্রজাতির পাখিরাও প্রজননের জন্য তাদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলবে।

বক ও পানকৌড়ির প্রজনন দেখতে গেলে দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়ক ঘেষা গ্রাম ফুলবাড়ী উপজেলার ২নং আলাদিপুর ইউনিয়নের বলিহরপুর গ্রামে যেতে হবে ভোর ৬টার আগে অথবা সন্ধ্যা ৬টার পরে।

ফুলবাড়ী থানা পুলিশ ইতোমধ্যে ওই এলাকায় গিয়ে সর্বস্তরের জনসাধারণকে পরিবেশবান্ধব এই পাখিগুলোকে যেন শিকারিরা এসে মারা কিংবা বিরক্ত করতে না পারে সেই লক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক আলোচনা করছেন। স্থানীয়রা বলছে, এই গ্রামটিকে বন বিভাগের পক্ষ থেকে ‘পাখি প্রজনন কেন্দ্র’ হিসেবে ঘোষণা করা হলে পাখির প্রতি মায়া-মমতা ও ভালোবাসা আরো বৃদ্ধি পাবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনাজপুর শহর থেকে ৩২/৩৩ কিলোমিটার পূর্ব দক্ষিণে এবং ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে ৭/৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ফুলবাড়ী উপজেলার ২নং আলাদিপুর ইউনিয়নের বলিহরপুর গ্রামে মহাসড়কে পাশে একটি খালের পাশে বাঁশঝাড় ও গাছের ডালে হাজার হাজার বক ও পানকৌড়ি আশ্রয় নেয়। তারা বাংলা বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহে আসতে শুরু করে এবং প্রজনন শেষে বাচ্চাগুলো বড় হওয়ার পর ভাদ্র মাসে চলে যায়।

Heron1

প্রায় ৫ মাস তারা এখানে অবস্থান করে থাক। গ্রামের পাশের নদী-নালা, খাল-বিল আর ফসলের মাঠ থেকে নানা জাতের মাছ, পোকামাকড় ও শামুক-ঝিনুক খেয়ে জীবন বাঁচে এই পাখিগুলোর। নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে বাসা বেঁধে প্রজনন থেকে শুরু করে ডিম দেয়া, ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানো, বাচ্চা বড় করা সব কিছু এখানেই তারা সম্পন্ন করে।

মানুষ বদলে যায়। পাখিরা বদলায় না। মানুষ গান ভুলে যায়। পাখিরা ভোলে না। পাখিরা পূর্বসূরিদের সকল রং-সৌন্দর্য, শিল্প, গীত নিয়ে সত্য হয়ে জন্মায় সুন্দর পৃথিবীতে, পূর্বসূরিদের সঙ্গে তারা বেঈমানি, প্রতারণা করে না। পাখিরা চিরকালই একই রকম, ওরা চিরকালের এমন হয়ে থাকে। তাই তারা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে এখানে গ্রায় ৭ বছর ধরে বছরে ৫ মাস বাস করে এসব বক ও পানকৌড়ি।

সারাক্ষণ চলে তাদের ডানা ঝাপটানো। নারী পাখিরা উড়ে যায় খাবার সংগ্রহ করতে। আবার খাবার সংগ্রহ করে খাবার মুখে করে নিয়ে এসে তুলে দিচ্ছে বাচ্চার মুখে। সারা দিন চলে তাদের এমন কর্মযজ্ঞ। তবে পুরুষ পাখিরা প্রজনন ছাড়া কোনো কাজ করে না। সন্ধ্যায় পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে হাজারো পাখির কলকাকলিতে। নির্বিঘ্নে রাত কাটিয়ে ভোর হলেই উড়ে যায়। দিন শেষে আবারও তারা নীড়ে ফিরে আসে।

Heron1

৭/৮ কিলোমিটার দূরের পানিকাটা গ্রাম থেকে পাখি দেখতে আসা আনোয়ার সাদাদ মন্ডল বলেন, এমন সুন্দর দৃশ্য বর্তমান সময়ে দেখতে পাওয়া বড় কঠিন। সকাল ও সন্ধ্যায় হাজারো পাখির কলকাকলির এই শব্দ অন্যরকম এক আবহ তৈরি করে, খুবই আনন্দদায়ক। আমার খুব ভালো লাগে। প্রায় দিন এখানে পাখি দেখতে চলে আসি। পাখির প্রতি এই গ্রামের লোকজনের ভালোবাসা ও নিরাপত্তা দেয়ায় এখানে পাখিগুলো প্রতি বছর আসে। একটু সরকারি সহায়তা পেলে এখানে পাখির ‘প্রজনন কেন্দ্র’ গড়ে উঠতে পারে।

বাশঁ ঝাড়ের মালিক নলিন চন্দ্র সরকার বলেন, গত সাত বছর যাবত আমার বাঁশঝাড়সহ বলিহরপুর গ্রামে অনেক বাঁশঝাড় ও গাছে বক ও পানকৌড়ি বাসা বেঁধে আসছে। আমি খুবই অনন্দিত। ফুলবাড়ী থানা থেকে পুলিশ এসে আমাদেরকে নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই পাখিগুলোকে যেন শিকারিরা এসে মারা কিংবা বিরক্ত করতে না পারে সেই জন্য সবাইকে সচেতন করে গেছেন। বলে গেছেন শিকারিরা এসে পাখিগুলোকে মারা কিংবা বিরক্ত করলে তাদেরকে খবর দিতে।

ওই গ্রামের সুবাস চন্দ্র রায় ও দিনেশ চন্দ্র রায় বলেন, এবার বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে পাখিগুলো খাবার সংকটে পড়েছে। বক এবং পানকৌড়ির প্রধান খাবার মাছ। জমিতে পানি না থাকায় মাছসহ অন্যান্য পোকামাকড় পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারিভাবে পাখিগুলোর জন্য খাবার ব্যবস্থা করা গেলে প্রজনন হয়তো আরও বেশি হত।

এমদাদুল হক মিলন/এমআরএম/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]