জমে উঠেছে ঐতিহ্যের নৌকা হাট

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ০৩:০২ পিএম, ০৭ আগস্ট ২০২১

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলা ঘিরে রয়েছে চলন বিল, রহুল বিলসহ বেশ কয়েকটি বিল। এসব বিল ঘিরে এলাকায় এক সময় নানা ঐতিহ্য থাকলেও বদলে যাওয়া প্রকৃতির প্রভাবে বিলুপ্ত হয়েছে অনেক ঐতিহ্য। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে বিলকে ঘিরে নৌকা তৈরি ও বেচা-কেনার ঐতিহ্য এখনো রয়ে গেছে।

উপজেলার মেন্দা কালিবাড়ি এলাকায় এখনও জমজমাট নৌকা তৈরি ও বেচা-কেনার হাট।

চলনবিল পাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো চলাফেরার জন্য পুরোদমে ব্যবহার করা হয় ডিঙি নৌকা। মেন্দা কালিবাড়ি এলাকার কারিগরদের তৈরি নৌকার রয়েছে বিশেষ চাহিদা। এ উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে নৌকা বিক্রি হচ্ছে পাশ্ববর্তী ফরিদপুর ও চাটমোহর উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও। নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে কালিবাড়ি এলাকার মিস্ত্রিদের।

jagonews24

সরেজমিনে কালিবাড়ি গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের মতো এবারও নৌকা বিক্রির ধুম পড়েছে। ডিঙি নৌকা তৈরিতে জড়িত এলাকার প্রায় অর্ধ শতাধিক পরিবার। একেকজন কারখানা মালিক শতাধিক করে নৌকা তৈরি ও বিক্রি করেন। তারা রেডিমেড নৌকা বানিয়ে রাখেন আবার কেউ অর্ডার দিলেও চাহিদা অনুযায়ী নৌকা তৈরি করে দেন।

নৌকার কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাঠভেদে তিন থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে নৌকা তৈরি করেন। মাছ ধরা আর বর্ষা মৌসুমে ব্যক্তিগত যাতায়াত ও পশু-পাখির খাদ্য সংগ্রহর জন্য নৌকা কেনেন বেশিরভাগ মানুষ।

কারিগর বিষ্ণু মিস্ত্রি (৫৫) বলেন, সাড়ে তিন হাজার থেকে শুরু করে ৯ হাজার টাকার নৌকা রয়েছে। সাড়ে তিন হাজার টাকার নৌকা আম কাঠ দিয়ে তৈরি। সেগুলো সাধারণত ১০ হাত হয়। আর ১২-১৩ হাত লম্বা নৌকা সাত থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

তিনি আরও জানান, কী কাঠ দিয়ে নৌকা বানানো হচ্ছে তার ওপর দাম নির্ভর করে।

jagonews24

জানা যায়, চৈত্র মাস থেকে নৌকা বানানো শুরু করে চলে কার্তিক পর্যন্ত। বাকি পাঁচ মাস ঘরের দরজা-জানালা তৈরি করেন কারিগররা। কালিবাড়ি এলাকায় অন্তত ৫০-৬০টি নৌকা তৈরির কারখানা রয়েছে। অনেকেই পৈত্রিক সূত্রে এ পেশায় আসলেও নতুন করেও আসছেন অনেকে। অনেক বেকার ছেলেরাও নৌকা তৈরির কাজ শিখে উপার্জন করছেন।

দিজো মিস্ত্রি (৫০) নামে আরেক নৌকার কারিগর জানান, পৈত্রিকভাবেই এই ব্যবসায় জড়িত। কারখানায় প্রায় পাঁচ-সাতজন মিস্ত্রি কাজ করে। ডিঙি নৌকা থেকে শুরু করে বাইচের নৌকাও তৈরি করি। এসব নৌকা চলনবিল এলাকার মোহনপুর, বড় মোহনপুর, ছোট পাঙ্গাসী, বড়পাঙ্গাসীসহ ধানুয়াঘাটা, লাউতারায় যায়। তবে বর্তমানে লোহা ও কাঠের দাম বেড়ে যাওয়ায় নৌকা তৈরির খরচ কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তিনি।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা ভবানীপুর এলাকা থেকে ডিঙি নৌকা কিনতে আসা আব্দুস সালাম (৫০) জানান, ব্যক্তিগত চলাচল এবং গো-খাদ্য আনতে তার নৌকা প্রয়োজন।

তাপস কুমার সূত্রধর নামে নৌকার এক কারিগর জানান, মহাজনের কাছে চুক্তিতে নৌকা তৈরি করেন তিনি। একটি নৌকা তৈরিতে মজুরি নেন ৭০০ টাকা।

jagonews24

আবুল কালাম আজাদ নামের এক কারিগর জানান, চুক্তিতে দুই বন্ধু মিলে নৌকা তৈরি করি। এতে দিনে সাত থেকে আটশ টাকা আয় হয়।

পাবনার ইতহাস ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করছেন ড. আশরাফ পিন্টু। তিনি জানান, দূর অতীত থেকেই চলনবিল অঞ্চলে নানা ধর্ম ও পেশার মানুষ বাস করে। বিল এলাকায় বিপুল সংখ্যক জেলে-জিয়ানীর বাস। নৌকা তাদের জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ। তাই বছরের পর বছর ধরে ডিঙি নৌকার এ বাজারের ঐতিহ্য চলে আসছে।

বিসিক পাবনার ডিজিএম রফিকুল ইসলাম জানান, নৌকা তৈরির ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা খুবই আন্তরিক। যেকোন প্রয়োজনে কারিগরদের সাধ্যমতো সহায়তা করা হবে।

আমিন ইসলাম জুয়েল/এএইচ/এমকেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।