৬৮ বছরেও কুমিল্লার কেউ জানে না বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কথা

জাহিদ পাটোয়ারী
জাহিদ পাটোয়ারী জাহিদ পাটোয়ারী , কুমিল্লা
প্রকাশিত: ০৫:২৪ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এটি স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও বিষয়টি সম্পর্কে জানে না ছাত্রছাত্রীরা। শুধু শিক্ষার্থী না, শিক্ষিত মহলের অনেকেই জানেন না বিদ্যালয়ে এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকার কথা। প্রচার-প্রসারেও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নেই।

সারাদেশে যে কয়টি বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে তার মধ্যে একটি রয়েছে কুমিল্লায়। কুমিল্লা জিলা স্কুল লাগোয়া জনবহুল এলাকা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। তবে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে অবগত নন অনেকেই। এর কারণ প্রতিষ্ঠার ৬৮ বছরেও শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটির সেবা। সাইনবোর্ড বাইরে প্রকাশ্য জায়গায় থাকার কথা থাকলেও রয়েছে অনেক ভেতরে। সে হিসেবে আশপাশের মানুষের বিষয়টি না জানারই কথা।

jagonews24

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ১৯৫৩ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুলের পাশেই স্থাপন করা হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আওতাধীন বর্তমানে প্রথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্ধলাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য বিবেচনায় দুজন মেডিকেল অফিসার, দুজন নার্স, একজন ফার্মাসিস্ট এবং একজন এমএলএস নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে একজন মেডিকেল অফিসার ও এমএলএস পদটি শূন্য রয়েছে।

আরও জানা যায়, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গত আট মাসে ৪০১ জন নারী-পুরুষ প্রতিষ্ঠানটি থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। গড় হিসাব করলে দেখা যায়, দৈনিক ১ দশমিক ৬৭ শতাংশ রোগী এসেছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে। তবে এদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র তিনজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিমাসে পরিদর্শন, স্বাস্থ্য কমিটি গঠন এবং প্রচার-প্রচারণার কথা থাকলেও তা না করায় ছাত্রছাত্রীসহ অনেক শিক্ষকও জানেন না বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নাম ও অবস্থান।

অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে নিয়োগপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ও নার্সরা নিয়মিত থাকেন না। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কেন্দ্রটি খোলা থাকার কথা থাকলেও নিজেদের খেয়ালখুশি মতো অফিস করছেন বর্তমান দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম সীমানার পশ্চিম-দক্ষিণ কর্নারে অবস্থান বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির। প্রবেশপথে অনেকটাই ভূতুড়ে পরিবেশ। ভেতরে রোগীহীন সুনশান নীরবতা। বারান্দায় এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চেয়ার-টেবিল। একপাশে অযত্নে পড়ে আছে মেডিকেল অফিসারের সাইনবোর্ড। এতে ধুলাবালি জমাট বেঁধে আছে।

দেখা গেলো, একটি কক্ষে তিন নারী বসে গল্প করছেন। পরিচয় দিয়ে কথা হয় বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ডা. চন্দনা রানী দেবনাথের সঙ্গে। তিনি জানান, বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছয়টি পদ রয়েছে। দুজন মেডিকেল অফিসার, দুজন নার্স, একজন ফার্মাসিস্ট এবং একজন এমএলএস। তার মধ্যে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে মেডিকেল অফিসার ও এমএলএস পদটি শূন্য রয়েছে।

গত দুই বছর ধরে কুমিল্লা সিটি কপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছেন ডা. চন্দনা রানী দেবনাথ। ফলে একই সময়ে এক ব্যক্তি দুই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘যখন যেখানে কাজ সেখানে দৌড়ে যায়।’

jagonews24

এক পর্যায়ে মেডিকেল অফিসার ডা. চন্দনা রানী দেবনাথ তার নির্ধারিত সময় আড়াইটার আগেই সহকর্মীদের রেখে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ত্যাগ করেন। নিয়মিত হাসপাতালে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই জায়গায় ডিউটি করে নিয়মিত উপস্থিত থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না।’

এ বিষয়ে কুমিল্লা জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র নাজমুছ সাকিব বলে, ‘আমাদের জন্য এমন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে তা আপনার মুখ থেকে এইমাত্র জানলাম।’

ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের প্রধান শিক্ষক হানিফ মজুমদার বলেন, কুমিল্লার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান থাকতে ৪-৫ বছর আগে আমাদের স্কুলে একটি স্বাস্থ্যক্যাম্পের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছি। এরপর আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রুহুল আমিন ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, আপনার মাধ্যমে আজ প্রথম জানলাম স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

তিনি বলেন, কুমিল্লার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমি দীর্ঘসময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছি, তবে বিদ্যালয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো কার্যক্রম আমার কাছে চোখে পড়েনি। এর একদম প্রচার নেই। আমি মনে করি, জেলা সিভিল সার্জনের এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. মীর মোবারক হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আমি ভিজিট করেছি। একটি ঘরের সামনে আরেকটি ঘর দেওয়া হলে কীভাবে দৃশ্যমান হবে আপনিই বলেন?

সেখানে দায়িত্বে থাকা মেডিকেল অফিসার কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে অতিরিক্ত মেডিকেল অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণে তিনি নিয়মিত বসতে পারেন না। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠার ৬৮ বছরেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিষয়ে কুমিল্লার মানুষ না জানার কারণ কী জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, এ ব্যাপারে আমরা উদ্যোগ নেবো।

জাহিদ পাটোয়ারী/এসআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]