শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবুজ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন আমিন উদ্দিন

আমিন ইসলাম জুয়েল আমিন ইসলাম জুয়েল , জেলা প্রতিনিধি ,পাবনা
প্রকাশিত: ০৩:১৯ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

পাবনার বেড়া উপজেলার একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাশীনাথপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ। কলেজটির মাঠে ঢুকতেই চোখে পড়বে সবুজের সমারোহ। জায়গায় জায়গায় ফল ও সবজির বাগান। পেঁপে থেকে শুরু করে টমেটো, মরিচ সবই চাষ হচ্ছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আর এ পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন শিক্ষার্থীরাই। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে অবসর সময়ে বাগানগুলোর পরিচর্যা করছেন। আর ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি নিয়েছেন কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও গবেষক ড. মো. আমিন উদ্দিন মৃধা এ উদ্যোগ নিয়েছেন।

‘একজন শিক্ষার্থী একটি সমন্বিত কৃষি খামার’ নামের একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করছেন আমিন উদ্দিন। ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি বাংলা মডেল’ নামে প্রকল্পটিকে দেশের সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। এতে কৃষিতে যুগান্তকারী সাফল্য আসবে বলে মনে করেন এ গবেষক।

jagonews24

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আমিন উদ্দিন মৃধা জাগো নিউজকে বলেন, দেশের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠের চারপাশ অব্যবহৃত থেকে যায়। শিক্ষার্থীদের অনেক সময় অবসর থাকে। পাঠের মাঝে তাদের মানসিক শান্তি দিতে বা সৃজনশীল কিছু করাতে পারলে তাদের দেহ-মন দুটোই ভালো থাকবে। এ ধারণা থেকে তিনি প্রকল্পটি হাতে নিয়েছেন।

প্রকল্পটির আওতায় প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীকে কাজে লাগাতে চান এ গবেষক। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, তার প্রস্তাবিত প্রকল্পে সরকারিভাবে কোনো বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন নেই। এমনকী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও এ মডেল বাস্তবায়নে কোনো অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন নেই। শাকসবজির সামান্য বীজ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে আনা ফলজ বা কাঠের গাছের চারা আনলেই হয়ে যাবে।

jagonews24

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা নয়, রাস্তার দুপাশ এবং রেললাইনের পার্শ্ববর্তী জায়গাও এ প্রকল্পে কাজে লাগাতে চান কৃষিবিজ্ঞানী আমিন উদ্দিন মৃধা। তবে এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন শিক্ষার্থীরাই। তার মতে, শিক্ষার্থী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সহযোগিতায় হাজার হাজার মসজিদ এবং অন্যান্য প্রার্থনা স্থানের ছাদকে ফলগাছের ছাদ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কাশীনাথপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে ড. আমিন উদ্দিন মৃধার পাইলট প্রকল্পটি এরই মধ্যে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কলেজের ভেতরে-বাইরে এখন যেন সবুজের মেলা। কলেজের ছাদ থেকে শুরু করে বারান্দা বা অফিস কক্ষ সব জায়গা নানা জাতের গাছ দিয়ে পরিপাটি করে সাজানো। কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগে তাদের সন্তুষ্টির কথা জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দুলাই সরকারি কলেজের প্রভাষক সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন শিক্ষার্থী তার অবসর সময়ে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারছেন। এতে সবজি বা ফলচাষের প্রতি তার একটা অভিজ্ঞতা ও হৃদ্যতা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এ চর্চা তার বাড়ির আঙিনায় বা ছাদে হবে। এটি তার সংসার জীবনেও কাজে লাগবে।

jagonews24

আমিনপুর থানার কদিমালঞ্চি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান বলেন, এটি একটি অনন্য মডেল। মডেলটি সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু হলে একটি নীরব সবজি বা ফল বিপ্লব হয়ে যাবে।

পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি যেমন, লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, কলমিশাক, কচুশাক, মুলাশাক, গিমাশাক, ডাটাশাক, ধনেপাতা, বেগুন, মরিচ, লাউ, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, চিচিঙ্গা, করলা, শসা; চারা রোপণ ও ফসল উৎপাদনের মধ্যবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র পরিসরে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল এমনকী মাছচাষেও সম্পৃক্ত করতে চান আমিন উদ্দিন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যাতে নিজ নিজ পরিবারে হার্টিকালচার, বনপালন এবং ওষুধি গাছ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ যেমন-পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, তাল, বেল, কামরাঙ্গা, সজিনা, নিম, বাতাবি লেবু, কাঠাল, আম এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠ উৎপাদনকারী গাছ তাদের বাড়ির আঙিনায় বা বাড়ির পাশে রোপণ করতে পারেন সে পরিকল্পনাও রয়েছে এ প্রকল্পে।

একজন খ্যাতিমান কৃষিবিদ হিসেবে ড. আমিন উদ্দিন মৃধা চাকরিকাল কাটিয়েছেন কৃষি গবেষণা এবং অধ্যাপনা করে। তিনিই দেশে প্রথমবারের মতো অনেকগুলো অ্যান্ডো-মাইকোরিজাল এবং অ্যাক্টো-মাইকোরিজাল ছত্রাক শনাক্ত করেছিলেন। এজন্য তাকে ‘ফাদার অব মাইকোরিজাল রিসার্চার’ নাম দিয়েছিলেন তার সহকর্মীরা।

jagonews24

চাকরিকাল শেষে অধ্যাপক আমিন উদ্দিন এখন গবেষণা শুরু করেছেন কৃষি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে। তারই উদ্ভাবিত একটি কৃষি প্রযুক্তির প্রায়োগিক কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। কাশীনাথপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্পটি এরই মধ্যে সাফলতা দেখেছে।

অধ্যাপক আমিন উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, তার উদ্ভাবিত প্রকল্পে সরকারিভাবে কোনো অর্থ ব্যয়িত হবে না। এটি স্থানীয়ভাবে খুবই স্বল্প ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এজন্য দরকার শুধু প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সদিচ্ছা। কারণ প্রতিটি বিদ্যালয়ের মাঠ কিছুটা ব্যবহৃত হলেও মাঠের চারদিক বা এককোণা পতিত পড়ে থাকে। এক্ষেত্রে তার ধারণাপত্রটি পাঠ্যবইয়ে সন্নিবেশিত হলে এটি বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে মনে করেন এ কৃষিবিজ্ঞানী।

আমিন ইসলাম জুয়েল/এসআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।