ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন, সড়কে পা হারিয়ে এখন শয্যাশায়ী মিন্টু

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৭:৪২ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০২১

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কাশিমা গ্রামের মো. মিন্টু (৪০) ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত বছরের ৪ জুন ভ্যান নিয়ে রঘুনাথপুর থেকে কালীগঞ্জ যাওয়ার পথে একটি ট্রাক তাকে চাপা দেয়। সে দুর্ঘটনায় অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেও চিকিৎসকদের পরামর্শে তার হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেলতে হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মিন্টু শয্যাশায়ী হওয়ায় তার পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

মিন্টুর ছেলে সাগর এখন মুয়াজ্জিনের চাকরি নিয়েছেন। তার তিন হাজার টাকা বেতনে চলছে সংসার। ছোট ছেলে আজিমের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। অভাবের কারণে নবম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে এ বছর বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। মিন্টু এখন কৃত্রিম পা সংযোজনের জন্য হাত পেতে বসে আছেন।

যশোর শহরের আরএন রোড জনতা ব্যাংক মহিলা শাখার সেকেন্ড অফিসার ছিলেন সদর উপজেলার বৈলতলা উত্তরপাড়ার বাসিন্দা আজিজুর রহমান (৪০)। ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় শহরের পালবাড়ি এলাকায় ইজিবাইকের ধাক্কায় পড়ে যান। ট্রাকচাপায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

স্বামী আজিজুরের মৃত্যুর পর স্ত্রী আজুরা বেগম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে ঠাঁই নেন বাবার বাড়িতে। আর সরকারি চাকরিজীবী ছেলের মৃত্যুর পর তার বাবা-মা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

শুধু আজিজুর বা মিন্টুর পরিবারই নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য পরিবারকে এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সব সেক্টরের সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

যশোরে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে ব্র্যাকের কমিউনিটি সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প। এ প্রকল্পের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে যশোরে ৬৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬১ জন নিহত হয়েছেন। ২০২০ সালেও ৬৭ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬২ জন। আর ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত ৩৯ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৭ জন। জেলা পুলিশের তথ্য-উপাত্তের সহযোগিতা নিয়ে এ পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।

ব্র্যাকের কমিউনিটি সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর গৌতম সরকার বলেন, সড়কে দুর্ঘটনার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। একটি পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দুর্ঘটনায় ৪৮ ভাগ পথচারী নিহত হন। তাই পথচারীদের সড়কে চলাচলের নিয়ম, যানবাহনে ওঠা নামার নিয়ম জানা জরুরি। যানবাহনের চালকদের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা রয়েছে। অনেক সড়ক, মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, মোড় এবং খানাখন্দ রয়েছে। এসবই দুর্ঘটনার কারণ। এছাড়া তিনটি ‘ও’ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এগুলো হলো- ওভারটেকিং, ওভারস্পিড এবং ওভারলোড।

তিনি বলেন, ব্র্যাকের কমিউনিটি সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের আওতায় এলাকাভিত্তিক সাধারণ মানুষ, চালক ও কমিউনিটি নেতাদের সড়কে চলাচল ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আজিজুল আলম মিন্টু বলেন, মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ মোড়, বাঁক ও যানজটের কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। যশোর-মাগুরা মহাসড়কের হুদোর মোড়, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বারোবাজার ও যশোর-খুলনা মহাসড়কের বসুন্দিয়া দুর্ঘটনাপ্রবণ। মহাসড়কের যানজট ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক দূর করতে হবে।

তিনি বলেন, এখন পরিবহন মালিক সমিতি যেভাবে সময় বেঁধে দেয়, তাতে যানজটে পরিবহন আটকা পড়লে চালকরা বেপরোয়া হতে বাধ্য হন। যানজট থেকে বেরিয়েই তারা সময়ের ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এছাড়া দেশে ৪৭ লাখ যানবাহনের লাইসেন্স থাকলেও চালকের লাইসেন্স আছে ২২-২৩ লাখ। বাকি যানবাহন চালান অদক্ষ চালকরা। এই চালকদের দক্ষ করে তোলা এবং এদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে প্রশাসন উদাসীন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) যশোরের সহকারী পরিচালক এসএম মাহফুজুর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সব সেক্টরকে একযোগে কাজ করতে হবে। সড়ককের বাঁক ও খানাখন্দ দূর করতে হবে, যানবাহনের মান নিশ্চিত করতে হবে। চালক, হেলপার, যাত্রী ও পথচারীদের চলাচলের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে এবং ট্রাফিক আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মিলন রহমান/ইউএইচ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]