অসময়ের বন্যায় সব শেষ তিস্তাপাড়ের কৃষকের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ০৪:৩৬ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০২১

তিস্তা অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও বাড়ছে দুর্ভোগ। অসময়ের বন্যায় কৃষকের স্বপ্নের ফসল নষ্ট হয়েছে। এ কারণে তিস্তাপাড়ের লাখো কৃষকের চোখেমুখে এখন অভাবের ছাপ। পরিবার-পরিজন নিয়ে সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

জেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রামে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কৃষকরা। কার্তিকে তিস্তার বুকে শীতকালীন শাকসবজি ছাড়াও ভুট্টা, বাদাম, রসুন, পেঁয়াজ, আলু, মসুর ডাল, ধান ও অন্যান্য ফসলের চাষ করেছিলেন তারা। কিন্তু হঠাৎ ভারতের উজান থেকে আসা পানিতে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। নদী তীরবর্তী গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ফসলের চরম ক্ষতি হয়েছে।

বন্যায় ফসল হারিয়ে দিশেহারা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চর রুদ্রেশ্বর গ্রামের সাইদুর রহমান। কয়েক বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছিলেন। একদিনের বন্যায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে বছরের বাকিটা সময় তিনি পার করবেন তা নিয়ে পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, অসময়ের বন্যা আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন কাটাবো কী করে?

Tista-(1).jpg

লালমনিরহাট কৃষি বিভাগ জানায়, আকস্মিক বন্যায় লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার নদীর তীরবর্তী ১৬ ইউনিয়নে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এক রাতের বন্যায় উঠতি আমন ধান ও অন্যান্য সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাদের হিসাব মতে, জেলার দুই হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমির আমন ধান ও অন্যান্য ফসল এ বন্যায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এসব ফসল হারিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বন্যার পানি কমে গেলেও বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। কিছু ক্ষেত থেকে পানি সরে গেলেও এসব ক্ষেতে ফসল আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা। পানি সরে যাওয়ার পরে ফসলে পচন ধরতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

কাকিনা ইউনিয়নের কৃষক নাজিম উদ্দিন বকস জাগো নিউজকে বলেন, ‘হামার আবাদি জমি সোগ তলে গেইচে। এ্যালা তিস্তার পানিত ধান, আলু, শাকসবজি সোগ ডুবি আছে। হঠাৎ এদোন করি ভারত পানি ছাড়লে হামরা বাঁচমো ক্যামন করি? একে তো গেল বানোত (বন্যা) হামার মেলা ক্ষয়ক্ষতি হইছে। তার ওপর এই অসময়ে ফির বান! নদী পাড়োত হামার সুখ-শান্তি নাই।’

Tista-(1).jpg

রুদ্রেশ্বর গ্রামের কৃষক জয়নাল মিয়া বলেন, ‘মহিপুর সেতুর কাছে চরোত একনা আগাম আলু আর মিষ্টিকুমড়া নাগাচু (চাষাবাদ করা)। শীতের সময় নয়া আলুর দাম বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু হঠাৎ তিস্তাত পানি বাড়ছে। হু হু করি পানি ঢুকি আবাদ সুবাদ সোগে তলে গেইচে।’

হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের চর ঠাংঝাড়া গ্রামের গ্রামের কৃষক মোকাদ্দেস বলেন, বন্যায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। আট বিঘা জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছিলাম। বন্যায় সব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

লালমনিরহাট মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, উজানে ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে মঙ্গলবার রাত থেকে তিস্তার পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। বুধবার সকালে এক নিমিষেই তিস্তার পানিতে প্লাবিত হয় নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো। ১৫ হাজার একরের বেশি জমির ফসল বন্যায় তলিয়ে গেছে। দেড় শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। পানির তোড়ে খামারের বিপুল সংখ্যক মুরগিও ভেসে গেছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান এলাকার মাছচাষি ইসমাইল হোসেন জানান, তার তিন লাখ টাকার মাছের ঘের নদীর পানিতে ভেসে গেছে।

Tista-(1).jpg

উপজেলার দোয়ানি গ্রামের শফিকুল জাগো নিউজকে বলেন, তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। পানিতে সব তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কী খাবো বুঝে উঠতে পারছে না।

অন্যদিকে দহগ্রাম, গড্ডিমারী, সানিয়াজান, সিঙ্গীমারী, সির্ন্দুনা, ভোটমারী, মহিষখোচা, রাজপুর, খুনিয়াগাছ ও গোকুন্ড ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রামের ফসলও পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

লালমনিরহাট কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আশরাফ বলেন, পানি কমে আসায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমিগুলো একটু একটু দেখা যাচ্ছে। তবে এখনো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে।

রবিউল হাসান/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]